আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেডিসিন সঁ ফ্রঁতিয়ের বা এমএসএফ জানিয়েছে, গাজা ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে কর্মরত তাদের কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হবে না। সংস্থাটি বলছে, কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ এবং তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা না থাকায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শুক্রবার দেওয়া এক বিবৃতিতে এমএসএফ জানায়, গত সপ্তাহে নির্দিষ্ট শর্তে কর্মীদের নাম দেওয়ার যে অবস্থান তারা নিয়েছিল, তা নিয়ে সহায়তা কর্মী ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। পরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তা না পাওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের কর্মীসংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত বছর ইসরায়েল নতুন নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার মানদণ্ডের কথা উল্লেখ করে একাধিক আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থার কাছে কর্মী, অর্থায়ন ও কার্যক্রম সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দাবি করে। মানবিক সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এ ধরনের দাবি সহায়তা কর্মীদের আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, বিশেষ করে এমন এক প্রেক্ষাপটে যেখানে দুই হাজার তেইশ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় সামরিক অভিযানে এক হাজার সাতশোর বেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে এমএসএফের অন্তত পনেরো জন কর্মী রয়েছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ইসরায়েল ৩৭টি সহায়তা সংস্থার লাইসেন্স বাতিল করে। এসব সংস্থার মধ্যে এমএসএফ, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি ও অক্সফামও রয়েছে। ইসরায়েলের প্রবাসবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারি করা বিধিমালা অনুযায়ী, সংস্থাগুলোকে পাসপোর্টের কপি, জীবনবৃত্তান্ত এবং শিশুদেরসহ পরিবারের সদস্যদের নামের মতো সংবেদনশীল তথ্য জমা দিতে বলা হয়।
এই বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, যেসব সংস্থার বিরুদ্ধে বর্ণবাদ উসকে দেওয়া, ইসরায়েলের অস্তিত্ব বা হলোকাস্ট অস্বীকার করা কিংবা শত্রু রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসী সংগঠনের সশস্ত্র কর্মকাণ্ড সমর্থনের অভিযোগ আনা হবে, তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।
এমএসএফ জানায়, কয়েক মাস ধরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে এসব শর্ত মেনে চলা কর্মীদের জন্য নিরাপদ নয়। সংস্থাটি বলছে, তারা চেয়েছিল কর্মীসংক্রান্ত তথ্য কেবল প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হবে, মানবসম্পদ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ কর্তৃত্ব এমএসএফের হাতে থাকবে এবং সংস্থার বিরুদ্ধে মানহানিকর প্রচার বন্ধ হবে—কিন্তু এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
মানবিক সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, এই ধরনের তথ্য গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে সহায়তা কর্মীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। তাদের মতে, প্রমাণ ছাড়াই সহায়তা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার ফলে ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে এবং জীবনরক্ষাকারী কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এমএসএফ গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে জরুরি ও সংকটকালীন চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে এমএসএফকে বহিষ্কার করা হলে এর প্রভাব হবে ভয়াবহ, বিশেষ করে শীতকালীন পরিস্থিতি, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও তীব্র মানবিক চাহিদার মধ্যে থাকা ফিলিস্তিনিদের জন্য।
সংস্থাটি জানায়, গাজায় মানবিক পরিস্থিতি এখনো চরম সংকটপূর্ণ। অক্টোবরের পর থেকে প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন, মৌলিক সেবা ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। দগ্ধ রোগীদের মতো বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবাও প্রায় অনুপস্থিত।
দুই হাজার পঁচিশ সালে এমএসএফ জানায়, তারা আট লাখের বেশি চিকিৎসা সেবা দিয়েছে, প্রতি তিনটি প্রসবের একটিতে সহায়তা করেছে এবং প্রতি পাঁচটি হাসপাতালের শয্যার একটির ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করেছে।
এমএসএফ বলেছে, তারা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত, যাতে গাজা ও পশ্চিম তীরে তাদের জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যায় এবং চরম প্রয়োজনের মুখে থাকা মানুষের কাছে জীবনরক্ষাকারী সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
















