বাড়ছে পানির উচ্চতা ও লবণাক্ততা; ২০৭০ সালের মধ্যে বাঘের আবাসস্থল বিলুপ্তির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগাররা এখন এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বনের অভ্যন্তরে খাদ্য সংকটের কারণে বাঘগুলো ক্রমাগত মানুষের বসতির কাছাকাছি চলে আসছে, যার ফলে বাড়ছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের নোনা পানি বনকে গ্রাস করছে, আর বাঘদের ঠেলে দিচ্ছে লোকালয়ের দিকে। গত দুই দশকে শুধু বাংলাদেশের অংশেই বাঘের আক্রমণে প্রায় ৩০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে বনে বাঘের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৪৫০টি বলে ধারণা করা হলেও, ক্রমবর্ধমান ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা এবং ভূমি ক্ষয় বাঘের প্রাকৃতিক বিচরণক্ষেত্রকে সংকুচিত করে তুলছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৭০ সালের মধ্যে সুন্দরবনে বাঘের উপযোগী কোনো আবাসস্থল অবশিষ্ট নাও থাকতে পারে।
সুন্দরবনের প্রান্তিক জনপদে এখন বাঘের আতঙ্ক নিত্যসঙ্গী। বননির্ভর সাত মিলিয়ন মানুষের জীবিকা এবং বাঘের টিকে থাকার লড়াই এখন এক সুতোয় গেঁথে গেছে।
বাঘের মুখে আবু সালেহ: এক অলৌকিক বেঁচে ফেরা
সাতক্ষীরার উপকূলীয় গ্রামের বাসিন্দা আবু সালেহ বাঘের আক্রমণ থেকে বেঁচে ফেরা এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তিনি জানান, মাছ ধরার সময় হঠাৎ একটি বাঘ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
- ভয়ংকর লড়াই: বাঘের মুখে নিজের হাত ঢুকে যাওয়ার পরও লাঠি দিয়ে টানা ৩০ মিনিট লড়াই করে বাঘটিকে হটিয়ে দেন তিনি।
- আঘাতের চিহ্ন: সালেহ বলেন, “বাঘের নখ আমার কাঁধে বসে গিয়েছিল। আমি লড়েছি কারণ পালানোর পথ ছিল না।” তার মতো অনেকেই এখন প্রতিনিয়ত এমন বিভীষিকার সম্মুখীন হচ্ছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিশাপ: কেন বাঘ লোকালয়ে?
সুন্দরবন বিশেষজ্ঞরা বাঘের আচরণের এই পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু পরিবেশগত কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি: নাসার তথ্যমতে, সুন্দরবনে প্রতি বছর গড়ে ৩ সেন্টিমিটার পানি বাড়ছে। এতে বনভূমি ডুবে যাওয়ায় বাঘের বিচরণক্ষেত্র কমে যাচ্ছে।
২. লবণাক্ততার প্রভাব: গত ৩০ বছরে মাটির লবণাক্ততা কোথাও কোথাও ১৫ গুণ বেড়েছে। এতে প্রিয় ‘সুন্দরী’ গাছ কমছে এবং বাঘের স্বাদু পানির উৎস হারিয়ে যাচ্ছে।
৩. খাদ্য সংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ: ঘূর্ণিঝড় আম্পানের মতো শক্তিশালী ঝড়গুলো বনের ইকোসিস্টেম ধ্বংস করে দিচ্ছে, ফলে বাঘ বাধ্য হয়ে সহজ শিকার হিসেবে মানুষকে বেছে নিচ্ছে।
উপকূলীয় মানুষের হাহাকার: ‘টাইগার উইডো’
বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীরা বা ‘বাঘ বিধবা’ (Tiger Widows) সমাজ ও পরিবারে নিগৃহীত হচ্ছেন। জাজন্তী বিশ্বাস ও পারুল বীরের মতো শত শত নারী এখন দিশেহারা। তারা জানান, জীবিকার তাগিদে প্রাণভয় উপেক্ষা করেই তাদের পুনরায় সেই বনেই মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যেতে হয়। সমাজ তাদের পাশে না দাঁড়ালেও বনই তাদের শেষ আশ্রয়।

সুরক্ষার উদ্যোগ: নাইলনের জাল ও বনায়ন
সংঘাত কমাতে সরকার ও স্থানীয় সংগঠনগুলো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে:
- নাইলন ফেন্সিং: বন ও লোকালয়ের সীমানায় ভারতের আদলে নাইলনের জাল বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
- টাইগার রেসপন্স ইউনিট: ৪৯টি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে যা বাঘ লোকালয়ে এলে তাকে নিরাপদে বনে ফিরিয়ে নিতে কাজ করে।
- ম্যানগ্রোভ রোপণ: ‘বেডস’ (BEDS)-এর মতো সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে ১০ লক্ষাধিক চারা রোপণ করেছে। স্থানীয় নারীরা এখন নার্সারি তৈরি করে বিকল্প জীবিকা খুঁজে নিচ্ছেন।
সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষ হয়তো ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ শব্দটির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানেন না, কিন্তু তারা বোঝেন—সমুদ্রের পানি বাড়ছে, বন ছোট হচ্ছে আর বাঘ আসছে তাদের উঠোনে। শুশান্তের ভাষায়, “সুন্দরবন আমাদের মা, আর বাঘের ঘর। বিশ্ববাসীর উচিত আমাদের এই ঘর রক্ষা করা।”
















