সাইকেলে সুন্দরবনের পথে ইউরোপীয় তিন বিশেষজ্ঞের ১৬০ কিলোমিটার টেকসই অভিযাত্রা
বরিশাল থেকে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের দিকে ১৬০ কিলোমিটার সাইকেল যাত্রার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি-সম্মত নির্মাণ ও সংরক্ষণ ভাবনার এক অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনজন ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞ।
বরিশালের ব্যস্ত নগরজীবন পেছনে ফেলে সুন্দরবনের শান্ত, পান্না-সবুজ জলরাশির দিকে সাইকেলে যাত্রা—সহজ কাজ নয়। তবে টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণে নিবেদিত তিনজন ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞের কাছে এই যাত্রা ছিল বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনকে কাছ থেকে বোঝার এক বাস্তব প্রস্তুতি।
২৭ থেকে ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত চার দিনের এই সফরে তাঁরা পাড়ি দেন প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পথ। ভ্রমণটি ছিল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের নয়, বরং প্রকৃতি-সম্মত স্থাপত্য ও সংরক্ষণ ভাবনা নিয়ে এক যৌথ চিন্তা ও অনুপ্রেরণার অভিজ্ঞতা।
এই অভিযাত্রায় অংশ নেন নেদারল্যান্ডসের জীববিজ্ঞানী ও পাখিপ্রেমী উলফ বিয়েরেন্স, পরিবেশবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য নিলস ভ্যান ডেন বার্গে এবং বাঁশভিত্তিক টেকসই আবাসন নিয়ে কাজ করা ফরাসি স্থপতি রাফায়েল আসকোলি। ভিন্ন পেশাগত পটভূমি হলেও তাঁদের অভিন্ন লক্ষ্য—নির্মাণে প্রকৃতিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা।
উলফ বিয়েরেন্স ও নিলস ভ্যান ডেন বার্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ‘ইজি হাউজিং’ উদ্যোগে, যা উগান্ডা ও কেনিয়ায় পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও কার্বন-নিরপেক্ষ ঘর নির্মাণে কাজ করছে। অন্যদিকে রাফায়েল আসকোলি ‘হাউজিং নাউ’-এর মাধ্যমে মিয়ানমারে টেকসই বাঁশের স্থাপত্য উন্নয়নে যুক্ত।
বন্যপ্রাণ ও জীববৈচিত্র্যের কাছাকাছি
ওয়াইল্ডটিম কনজারভেশন বায়োলজি সেন্টারে অবস্থানকালে সাইকেল ছেড়ে নৌকায় চড়ে তাঁরা সুন্দরবনের গভীরে প্রবেশ করেন। কাদামাটিতে রোদ পোহানো লবণজলের কুমির, গাছের ডালে দোল খাওয়া বানর ও পানিতে ভেসে ওঠা ডলফিন তাঁদের মুগ্ধ করে। পাখির বৈচিত্র্য উলফ বিয়েরেন্সের কাছে ছিল বিশেষ আকর্ষণ।
তার ভাষায়, একজন জীববিজ্ঞানী হিসেবে এই প্রতিবেশব্যবস্থার দৃঢ়তা নিজের চোখে দেখা গভীরভাবে বিনয়ী করে তোলে এবং মনে করিয়ে দেয়—নির্মিত পরিবেশে প্রকৃতিকে বাদ না দিয়ে বরং তাকে অন্তর্ভুক্ত করাই টেকসই পথ।
মানুষ ও সংরক্ষণের বন্ধন
সুন্দরবনের প্রকৃতির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তাও ছিল এই যাত্রার বড় অভিজ্ঞতা। গ্রামাঞ্চল পেরিয়ে সাইকেল চালানোর সময় তাঁরা স্থানীয়দের আন্তরিকতা অনুভব করেন এবং হঠাৎ একটি গ্রামীণ বিয়ের অনুষ্ঠানেও অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এতে সুন্দরবন ও এখানকার মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
ওয়াইল্ডটিমের স্থানীয় পর্যায়ের সংরক্ষণ কার্যক্রমও তাঁদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে। নিলস ভ্যান ডেন বার্গে বলেন, মানুষ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ব্যবধান কমাতে ওয়াইল্ডটিম যে ভূমিকা রাখছে, তা সময়োপযোগী ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ভবিষ্যতের নকশায় সুন্দরবনের ছাপ
রাফায়েল আসকোলির কাছে এই সফর ছিল নতুন স্থাপত্য ভাবনার উৎস। স্থানীয় গেস্টহাউসে অবস্থান করে তিনি দেখেছেন, কীভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নকশাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
তার মতে, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মাণ—হোক তা মিয়ানমারের বাঁশ বা সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ—একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দাবি করে। সুন্দরবন শেখায়, কাঠামোকেও হতে হবে শিকড়ের মতো অভিযোজিত ও পরস্পরসংযুক্ত।
চার দিনের এই যাত্রা শেষ হলেও তাঁদের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণার পথচলা এখনো চলমান। পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের প্রকল্পে ফিরে গিয়ে তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন সুন্দরবনের এক স্পষ্ট বার্তা—সবচেয়ে টেকসই নকশা সেইগুলোই, যা বন্য প্রকৃতিকে সম্মান জানায়।
















