ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারকে বহনকারী একটি বেসরকারি বিমান বুধবার দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে অজিত পাওয়ারসহ বিমানে থাকা আরও চারজন নিহত হন বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
মুম্বাই থেকে মহারাষ্ট্রের বারামাতি যাওয়ার পথে বিমানটি রাজ্যের রাজধানী থেকে প্রায় ২৫৪ কিলোমিটার দূরে একটি খোলা মাঠে জরুরি অবতরণের চেষ্টা করে। এ সময় বিমানটি আগুন ধরে বিস্ফোরিত হয়। দুর্ঘটনার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি এবং তদন্ত শুরু হয়েছে।
অজিত পাওয়ার ছিলেন মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি। ৬৬ বছর বয়সী এই নেতা ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজ্য মহারাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নির্বাচিত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে রাজ্য সরকারে ছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি বিরোধী দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি থেকে বিভক্ত হয়ে একটি আলাদা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেন, যা বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়।
মহারাষ্ট্রের চিনি উৎপাদনপ্রধান অঞ্চলে অজিত পাওয়ারের প্রভাব ছিল ব্যাপক। গ্রামীণ ভোটারদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি দক্ষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
১৯৫৯ সালের ২২ জুলাই জন্ম নেওয়া অজিত পাওয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে। তাঁর রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর কাকা শরদ পাওয়ার। ১৯৯১ সালে তিনি প্রথমবারের মতো বারামাতি আসন থেকে মহারাষ্ট্র বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং টানা আটবার এই আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৯৯৯ সালে শরদ পাওয়ার ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি গঠন করলে অজিত পাওয়ার সেখানে যোগ দেন। পরবর্তী দুই দশকে তিনি একাধিকবার মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৯ সালে তিনি সাময়িকভাবে এনসিপি ছাড়িয়ে বিজেপির সঙ্গে সরকারে যোগ দেন, তবে পরে আবার দলে ফিরে আসেন। ২০২৩ সালে তিনি এনসিপির ভেতরে বড় ধরনের বিভাজন ঘটান এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের নির্বাচন কমিশন তাঁর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকেই এনসিপির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। একই বছর তিনি ষষ্ঠবারের মতো মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
অজিত পাওয়ারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মূলত অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে পিম্প্রি-চিঞ্চওয়াড় ও বারামাতি এলাকায় সড়ক সম্প্রসারণ, নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি এবং নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও ছিল। মহারাষ্ট্রের একটি সেচ প্রকল্পে অনিয়ম এবং পুনে শহরে জমি কেলেঙ্কারির ঘটনায় তাঁর নাম উঠে আসে। যদিও এসব অভিযোগে সরকারি তদন্ত এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
দুর্ঘটনার দিন সকালে অজিত পাওয়ার স্থানীয় নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে বারামাতির উদ্দেশে রওনা হন। ভিএসআর ভেঞ্চার্স পরিচালিত একটি লিয়ারজেট বিমান সকাল সাড়ে আটটার দিকে বারামাতি বিমানবন্দরে নামার সময় দুর্ঘটনায় পড়ে বলে জানায় ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিমানটি মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায় এবং একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে। আগুনের তীব্রতার কারণে কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বিমানে অজিত পাওয়ারের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা, একজন সহকারী এবং দুইজন ক্রু সদস্য ছিলেন।
এই দুর্ঘটনায় ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় অজিত পাওয়ারকে জনগণের নেতা হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী একে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা বলে মন্তব্য করেন। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ জানান, তিনি একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মীকে হারালেন।
















