সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে সিরীয় সেনাবাহিনী বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই লড়াইয়ের ফলে বিশেষ করে আরব-অধ্যুষিত এলাকায় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘদিন এসডিএফের প্রধান পৃষ্ঠপোষক থাকা যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করলেও দামেস্কের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে বলেছে, এসডিএফের এখন নতুন সিরীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সময় এসেছে। বাশার আল-আসাদের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকেই এই নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এসডিএফকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে সিরিয়া বিষয়ক কাজে যুক্ত থাকার সময় একাধিক কর্মকর্তা সতর্ক করেছিলেন, এসডিএফকে সমর্থন দিলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হবে এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও গভীর হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইএসের উত্থানের মূল কারণগুলো মোকাবিলা করাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশি কার্যকর হতো। এর মধ্যে ছিল আসাদ সরকারের দমনমূলক নীতি এবং ইরাকের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকির সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সে পথে না গিয়ে ওয়াশিংটন এমন এক কৌশল নেয়, যা সিরিয়াকে বিভক্ত করার ঝুঁকি তৈরি করে এবং তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এসডিএফের ভেতরে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির কট্টরপন্থি প্রভাব ছিল, যারা তুরস্কের বিরুদ্ধে সক্রিয় লড়াইয়ে জড়িত। এতে ন্যাটোভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ মিত্র তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে এসডিএফ সিরিয়ার অন্যান্য বিরোধী গোষ্ঠী ও কুর্দি দলগুলোর সঙ্গেও দ্বন্দ্বে জড়িত ছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, শেষ পর্যন্ত যে পক্ষই জয়ী হোক না কেন, এসডিএফকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই ফিরে যেতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনুকূল এক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। প্রথমত, বিজয়ী শক্তির পক্ষ থেকে কুর্দি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়নি। বরং সরকার কুর্দি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে এবং সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মানবিক করিডোর চালু করেছে।
গত ১৬ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা কুর্দিদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং আরবির পাশাপাশি কুর্দি ভাষাকে জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্ত এসডিএফের সেই দাবিকে দুর্বল করেছে যে, কেবল তারাই কুর্দি অধিকার রক্ষার একমাত্র শক্তি। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পুরোনো ভুল এড়াতে সচেষ্ট থেকেছে।
দ্বিতীয়ত, সিরীয় সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সজ্জিত একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর সামরিক সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। এতে ওয়াশিংটনের কাছে দামেস্ক একটি সক্ষম ও ইচ্ছুক নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে নতুনভাবে বিবেচিত হচ্ছে।
তৃতীয়ত, সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এতে সিরিয়ার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত হবে এবং বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমবে। এই খাতগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি এখনও পরিবর্তনশীল। সাম্প্রতিক সাফল্যের পর দামেস্কের জন্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বেছে নেওয়াই যুক্তিসংগত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। চলমান সংঘাত অব্যাহত থাকলে মানবিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি বাড়বে। ১৮ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতিতে এসডিএফের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একীভূত করার কথা বলা হলেও, সামরিক কাঠামো একীভূত করার প্রশ্নে সমঝোতা হয়নি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, উভয় পক্ষেরই যুদ্ধবিরতির শর্ত বাস্তবায়নে মনোযোগ দেওয়া উচিত। আল-শারা বর্তমানে শক্ত অবস্থানে থাকলেও শান্তিপূর্ণ সমাধানের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়কসুলভ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। অন্যদিকে, এসডিএফের জন্য বিকল্প ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। এই বিরতি কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মতো কিছু সমাধান নিশ্চিত করার সুযোগ এনে দিতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আল-শারার কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য—একটি ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল সিরিয়া—এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন নেতৃত্ব দেশকে একীভূত করে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবে কি না। সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো সেই প্রশ্নের ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
















