কলম্বিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর জীবনগাথা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসেরই এক প্রতিচ্ছবি। একসময় সশস্ত্র বিদ্রোহী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা পেত্রো আজ দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশের প্রথম প্রগতিশীল রাষ্ট্রপ্রধান।
১৯৬০ সালে জন্ম নেওয়া পেত্রো শৈশব থেকেই ক্ষমতা ও বৈষম্যের প্রশ্নে সংবেদনশীল ছিলেন। শিক্ষাজীবনে তিনি যুক্ত হন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে। সত্তরের দশকে তিনি এম–১৯ নামে পরিচিত একটি শহরভিত্তিক বিদ্রোহী আন্দোলনে যোগ দেন, যার লক্ষ্য ছিল দুই দলকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে একটি গণতান্ত্রিক কলম্বিয়া গড়া। যদিও তিনি অস্ত্র ব্যবহার শিখেছিলেন, মূলত প্রচার ও সংগঠনের কাজেই যুক্ত ছিলেন।
আশির দশকের শুরুতে পেত্রো প্রকাশ্যে বিদ্রোহী পরিচয় স্বীকার করেন। এরপর গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও কারাবাসের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। কারাগার থেকে মুক্তির পর সশস্ত্র রাজনীতি ছেড়ে তিনি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসেন। নব্বইয়ের দশকে এম–১৯ রাজনৈতিক দলে রূপ নেয় এবং পেত্রো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সংসদে থেকেই তিনি দেশজুড়ে আলোচিত হন। রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনী ও ডানপন্থী আধাসামরিক গোষ্ঠীর যোগসাজশ প্রকাশ্যে তুলে ধরেন তিনি। এসব অভিযোগের কারণে একাধিকবার মৃত্যুহুমকির মুখে পড়তে হয় তাঁকে। নিরাপত্তার স্বার্থে একপর্যায়ে বিদেশে কূটনৈতিক দায়িত্বও পালন করেন।
২০১১ সালে তিনি বোগোতার মেয়র নির্বাচিত হন। মেয়র হিসেবে অপরাধ কমানো, সামাজিক সুরক্ষা, মাদকাসক্তদের স্বাস্থ্যসেবায় আনা এবং পরিবেশবান্ধব নীতির মতো উদ্যোগ নেন। তবে প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে তাঁর মেয়াদকাল ছিল বিতর্কপূর্ণ।
২০২২ সালে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর গুস্তাভো পেত্রো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ক্ষমতায় এসে তিনি বৈষম্য কমানো, পরিবেশ সুরক্ষা, মাদক নীতির সংস্কার এবং সশস্ত্র সংঘাতের অবসানে ‘সম্পূর্ণ শান্তি’ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আলোচনার টেবিলে আনা।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পেত্রো সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। জলবায়ু সংকট, মাদকবিরোধী যুদ্ধের সমালোচনা এবং গাজায় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো সিদ্ধান্ত তাঁকে বৈশ্বিক আলোচনায় নিয়ে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির সমালোচনাও তিনি প্রকাশ্যে করেছেন।
তবে তাঁর শাসনামল সহজ ছিল না। শান্তি পরিকল্পনা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি, মন্ত্রিসভায় ঘন ঘন পরিবর্তন হয়েছে, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক বিরোধিতা বেড়েছে। জনপ্রিয়তার হারও সময়ের সঙ্গে কমেছে। এ ছাড়া তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরকারকে আরও চাপের মুখে ফেলে।
তবুও সমর্থকদের মতে, পেত্রোর শাসন কলম্বিয়ায় সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। তাঁর জীবনপথ একদিকে বিদ্রোহ, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের গল্প। মেয়াদ শেষে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, কলম্বিয়ার রাজনীতিতে তিনি যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
















