যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র শীতকালীন ঝড়ের প্রভাবে ব্যাপক ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। ঝড়ের আগেই হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং অন্তত এক লাখের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। বরফ ও জমাট বৃষ্টিতে দেশের প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জাতীয় আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ রকি পর্বতমালা থেকে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে ভারী তুষারপাত, বরফকণা ও হিমায়িত বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এতে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ, অর্থাৎ দেশের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কর্তৃপক্ষ জনগণকে টানা কয়েক দিন তীব্র শীতের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঝড়কে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে দক্ষিণ ক্যারোলাইনা, ভার্জিনিয়া, টেনেসি, জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা, মেরিল্যান্ড, আরকানসাস, কেনটাকি, লুইজিয়ানা, মিসিসিপি, ইন্ডিয়ানা ও ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল জরুরি দুর্যোগ ঘোষণা অনুমোদন দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি সবাইকে নিরাপদ ও উষ্ণ থাকার আহ্বান জানান।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কলম্বিয়া জেলা সহ ১৭টি অঙ্গরাজ্যে আবহাওয়াজনিত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। বিভাগের সচিব জানিয়েছেন, দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যগুলোতে বহু মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে এবং বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারে কাজ চলছে। একই সঙ্গে তিনি জনগণকে জ্বালানি ও খাদ্য মজুত রাখার পরামর্শ দেন।
আবহাওয়াবিদেরা সতর্ক করে বলেছেন, বিশেষ করে যেসব এলাকায় বরফের আস্তরণ জমেছে, সেখানে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ঘূর্ণিঝড়ের মতো হতে পারে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের জন্য নির্ধারিত চার হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। রোববারের জন্য নির্ধারিত আরও নয় হাজারের বেশি ফ্লাইটও বাতিল করা হয়েছে, যা এখনো বাড়ছে। বিমান বিশ্লেষণ সংস্থাগুলোর মতে, মহামারির পর এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা।
প্রধান এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের হঠাৎ সময়সূচি পরিবর্তন ও বাতিলের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছে। দক্ষিণ ও পূর্ব উপকূলের বেশ কয়েকটি বিমানবন্দরে বরফ অপসারণ ও লাগেজ ব্যবস্থাপনায় সহায়তার জন্য বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত টেক্সাস ও লুইজিয়ানায় সবচেয়ে বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। ডালাসে তাপমাত্রা নেমে গেছে মাইনাস ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াসে। হিউস্টনের মেয়র বাসিন্দাদের অন্তত বাহাত্তর ঘণ্টার জন্য ঘরে অবস্থান করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ওকলাহোমা ও আরকানসাসে কোথাও কোথাও পনেরো সেন্টিমিটার পর্যন্ত তুষার জমেছে। আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, এটি চলতি মৌসুমের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিস্তৃত ঝড়। নর্থ ডাকোটা, সাউথ ডাকোটা ও মিনেসোটায় অনুভূত তাপমাত্রা নেমে গেছে মাইনাস পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। এ ধরনের ঠান্ডায় অল্প সময়ের মধ্যেই শরীরে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
দক্ষিণ লুইজিয়ানা, মিসিসিপি ও টেনেসির কিছু এলাকায় প্রায় আড়াই সেন্টিমিটার পুরু বরফ জমে গাছ, বিদ্যুতের লাইন ও সড়ক ঢেকে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল অতিক্রম করার পর ঝড়টি মধ্য আটলান্টিক ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্যগুলোতে আঘাত হানতে পারে, যেখানে ত্রিশ সেন্টিমিটারের বেশি তুষারপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে ঘরে থাকার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, নিজের ও প্রিয়জনের নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিউ জার্সির গভর্নর বাণিজ্যিক যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ এবং মহাসড়কে গতিসীমা কমিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বহু বছরের মধ্যে এমন ভয়াবহ শীতকালীন ঝড় দেখা যায়নি, তাই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
















