‘৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে রেজিম চেঞ্জ’; লুটেরাতন্ত্র রেখে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ককে দেশের জন্য এক ‘ভয়ঙ্কর অশনিসংকেত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বিশিষ্ট চিন্তক ও কবি ফরহাদ মজহার। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত ‘জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব’ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় ফরহাদ মজহার বলেন, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একটি ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসক পরিবর্তন হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এই প্রভাব ১৭ কোটি মানুষের স্বাধীন অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। রাষ্ট্র সংস্কার ও লুটেরাতন্ত্র উৎখাত না করে দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করলে সেই সরকার জনগণের হবে না বলেও তিনি দাবি করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
‘গণ-অভ্যুত্থান সুরক্ষা মঞ্চ’ আয়োজিত ‘দেশব্যাপী গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট: সমাজের করণীয়’ শীর্ষক সভায় ফরহাদ মজহার সমসাময়িক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ করেন।
জামায়াত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ও সাম্রাজ্যবাদ
ওয়াশিংটন পোস্টের বরাত দিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ফরহাদ মজহার বলেন:
- পরিকল্পিত সম্পর্ক: জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি ও সম্পর্ক রয়েছে, যা আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল। গাজায় ‘স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ পাঠানোর বিষয়ে জামায়াতের অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি একে বিপজ্জ্বনক হিসেবে উল্লেখ করেন।
- ভারত ও মার্কিন আধিপত্য: তিনি বলেন, “আপনারা ভারতবিরোধিতার কথা বলেন, ভারতের আধিপত্য আমি স্বীকার করি। কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কথা কেন বলেন না?”
- ট্রাম্পের বাস্তবতা: বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ট্রাম্প প্রশাসনের রূঢ় বাস্তবতায় বাংলাদেশকে কোনো যুদ্ধে না জড়িয়ে ১৭ কোটি মানুষের ‘ডাল-ভাত’ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
অভ্যুত্থান ও ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’
৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ফরহাদ মজহারের বিশ্লেষণ: ১. রেজিম চেঞ্জ: তাঁর মতে, শেখ হাসিনাকে সরানো কোনো বড় ইস্যু ছিল না, কারণ যুক্তরাষ্ট্রই তা করতে চেয়েছিল। মূল কাজ ছিল নতুন রাষ্ট্র গঠন করা, যা এখনো সফল হয়নি। ২. সৈনিক ও জনগণের মৈত্রী: গণ-অভ্যুত্থান ছাত্র-জনতা ও সৈনিকদের মৈত্রীর ফল উল্লেখ করে তিনি সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দেন।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট: একটি রাজনৈতিক লুণ্ঠন
দেশের বর্তমান সেবা খাতের সংকটকে ‘প্রাকৃতিক নয়, বরং রাজনৈতিক’ বলে আখ্যা দেন তিনি:
- লুটপাটতন্ত্র: বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বেসরকারি কেন্দ্রগুলো রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে টাকা নিচ্ছে। এই আইনি কাঠামো পরিবর্তন না করলে সংকট কাটবে না।
- মৌলিক অধিকার: বিশুদ্ধ পানি ও জ্বালানির সংকট মূলত নদী দখল ও বাণিজ্যিক লুণ্ঠনের ফল। ফরহাদ মজহারের মতে, প্রকৃত রাজনীতি হলো সম্পদ ও জমির ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
নির্বাচন বনাম রাষ্ট্র গঠন
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, “লুটেরাতন্ত্র উৎখাত না করে নির্বাচন করলে তা হবে কেবল ভাগ-বাঁটোয়ারার রাজনীতি। জনগণের রাজনীতি মানে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা।” তিনি আগে রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং পরে নির্বাচনের পক্ষে তাঁর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন আহমেদ ফেরদৌস এবং ভাববৈঠকীর সংগঠক মোহাম্মদ রোমেল। বক্তারা একমত হন যে, জনগণের জীবনধারণের মৌলিক শর্তগুলো নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত বর্তমান সময়ের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য।
















