লাইসেন্সহীন ভাটার ধোঁয়া–তাপে হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি, নীরব প্রশাসন নিয়ে প্রশ্ন
ফসলি জমি ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটার দাপটে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকির মুখে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ফসলি জমি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে অন্তত ৩৮টি অবৈধ ইটভাটা। এসব ভাটার একটিরও পরিবেশ অধিদফতর–এর হালনাগাদ ছাড়পত্র নেই। বিষাক্ত ধোঁয়া, প্রচণ্ড তাপ ও নির্বিচারে মাটি কাটার কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্য।
সরেজমিনে বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, তিন ফসলি জমির মাঝখানে কিংবা স্কুল–বসতবাড়ির একেবারে কাছে ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় চারপাশ সারাক্ষণ আচ্ছন্ন থাকছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, এসব ভাটার প্রভাবে আম, কাঁঠাল ও লিচু বাগানে ফলন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। ধানসহ অন্যান্য ফসলেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক ক্ষতি।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, জমির উর্বর উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) কেটে ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করায় স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জমির উৎপাদন ক্ষমতা। ইট ও মাটি বহনকারী অবৈধ ট্রাক্টরের চলাচলে গ্রামীণ পাকা সড়ক ভেঙে পড়ছে।
ভাটার দাপটে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী
রানীপুকুর, জায়গীরহাট, শঠিবাড়ী ও বড়বালা এলাকায় অধিকাংশ ভাটার অবস্থান। পায়রাবন্দ ইউনিয়নের লোহনী এলাকায় মেসার্স নর্থ বেঙ্গল ব্রিকস (এনবিবি) এবং রানীপুকুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের এবিএস ব্রিকস–এর কারণে স্থানীয়রা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। দিনরাত ধুলোবালিতে ঢেকে যাচ্ছে এলাকা, বাড়ছে শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগ।
একই অবস্থা পায়রাবন্দ ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর এলাকার মেসার্স আবদুল্লাহ ব্রিকস–এর। কাগজে-কলমে বন্ধ দেখালেও বাস্তবে সেখানে ইট পোড়ানো অব্যাহত রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের তালিকায় ভাটাটি বন্ধ দেখানো হলেও সরেজমিনে মিলছে ভিন্ন চিত্র।
আইন লঙ্ঘন, তবু ব্যবস্থা নেই
‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ (সংশোধিত ২০১৯) অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বসতবাড়ির এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন এবং জ্বালানি হিসেবে বনের কাঠ ব্যবহার নিষিদ্ধ। কিন্তু মিঠাপুকুরে অধিকাংশ ভাটাই স্কুল ও ঘরবাড়ির একেবারে পাশে স্থাপিত এবং নির্বিচারে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ।
পরিবেশ অধিদফতর সূত্র নিশ্চিত করেছে, উপজেলায় পরিচালিত ৩৮টি ইটভাটার একটিরও বৈধ লাইসেন্স নেই। উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে এখনো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করে ভাটা মালিকরা উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. পারভেজ, মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, অবৈধ ইটভাটার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। “খুব শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে,”—বলেন তিনি।
তবে সচেতন মহলের মতে, কেবল লোকদেখানো জরিমানা নয়; রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবমুক্ত হয়ে স্থায়ীভাবে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ না করলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
















