নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রথমবারের মতো সৌর ও বায়ু শক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ও গ্যাসকে পেছনে ফেলেছে। গত বছর ইইউর মোট বিদ্যুতের ৩০ শতাংশ এসেছে সৌর ও বায়ু শক্তি থেকে, যেখানে কয়লা ও গ্যাসের অংশ ছিল ২৯ শতাংশ।
জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা সংস্থা এমবার বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ইউরোপীয় বিদ্যুৎ পর্যালোচনা প্রতিবেদনে জানায়, এটি ইউরোপের সবুজ ও স্বনির্ভর জ্বালানিতে রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
প্রতিবেদনটির লেখক বিয়াত্রিসে পেত্রোভিচ বলেন, এই অর্জন প্রমাণ করে যে ইউরোপ দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী জ্বালানি থেকে সরে আসছে। জলবিদ্যুৎ ও কৃষি ও খাদ্যবর্জ্য থেকে উৎপাদিত বায়োমাস বিদ্যুৎ যুক্ত করলে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ শতাংশে। এর বাইরে পারমাণবিক শক্তি থেকে এসেছে আরও ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎ, যা কার্বনমুক্ত হিসেবে বিবেচিত।
গবেষণায় বলা হয়েছে, সৌর বিদ্যুতের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিই এই পরিবর্তনের মূল কারণ। টানা চার বছর ধরে প্রতি বছর প্রায় ২০ শতাংশ হারে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়াও এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে।
এমবার জানায়, ইউরোপের জ্বালানি রূপান্তরের বড় অংশ এসেছে বড় শিল্পভিত্তিক সৌর ও বায়ু প্রকল্প থেকে নয়, বরং বাড়ির ছাদে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে। গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ ইইউর মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম, যা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ বছর ধরে সৌর ও বায়ু শক্তি রেকর্ড হারে বাড়ছে। এতদিন বিদ্যুৎ বাজার বড় হওয়ায় কয়লা ও গ্যাসের জন্যও জায়গা ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো সৌর ও বায়ু শক্তির প্রবৃদ্ধি মোট বিদ্যুৎ বাজারের বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যায় এবং বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানির অংশ কমতে শুরু করে।
এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাব দেখা গেছে চীন ও ভারতের মতো বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোতেও। গত বছর চীনে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এক শতাংশ কমেছে, যা এক দশকের মধ্যে প্রথম পতন।
তবে সব দেশেই পরিস্থিতি একরকম নয়। গ্রিসে সৌর বিদ্যুতের সক্ষমতা দ্রুত বাড়লেও বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের সীমাবদ্ধতায় উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ গ্রিড থেকে বাদ দিতে হচ্ছে। দেশটির সৌর শক্তি উৎপাদকদের সংগঠনের প্রধান স্তেলিওস লুমাকিস জানান, ২০২৫ সালে গ্রিসে সৌর বিদ্যুৎ সক্ষমতা বেড়ে ১২ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে। ফলে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তিনি সতর্ক করেন, প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা না গড়ে উঠলে অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে, কারণ সেখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আবার বাড়ছে। দেশটির বর্তমান প্রশাসন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ না করার অঙ্গীকার করেছে এবং সৌর ও বায়ু প্রকল্পে দেওয়া আগের ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
এমবারের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক এগিয়ে। তবে গবেষকেরা বলছেন, পরিষ্কার জ্বালানিতে রূপান্তরকে স্থায়ী করতে আইন ও আদালতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শক্তিশালী নীতিমালা ও আইনি লড়াইই এই পরিবর্তনকে অপরিবর্তনীয় করে তুলতে পারে।
















