আমদানি বাড়লেও কমছে না নিত্যপণ্যের দাম, বন্দরে আটকে ৪৫ লাখ টনের বেশি ভোগ্যপণ্য
আমদানি ও শুল্কছাড় থাকা সত্ত্বেও রমজানের আগেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—বন্দর জট, মুনাফালোভী আচরণ ও দুর্বল বাজার তদারকির কারণে ভোক্তারা সুফল পাচ্ছেন না।
পবিত্র রমজান শুরুর প্রায় এক মাস আগেই দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। গত এক সপ্তাহে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, চিনি, ডাল, ছোলা ও আদাসহ একাধিক পণ্যের দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার রমজানকে সামনে রেখে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কোনো কোনো পণ্যের আমদানি প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাজারে সরবরাহ বাড়েনি, উল্টো বেড়েছে দাম।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে ছোলার দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে মানভেদে ৭০–৭৫ টাকায় উঠেছে। অ্যাংকর ডালের দাম ২ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৫–৪৮ টাকায়। পাইকারি পর্যায়ে চিনি ও পাম অয়েলের দামও বেড়েছে—প্রতি মণ (৪০ কেজি) চিনি ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং পাম অয়েল ৫ হাজার ৯৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আদা ও রসুনের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে খুচরা বাজারেও পড়তে শুরু করেছে।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)–র বাজারদর প্রতিবেদনে রাজধানীর খুচরা বাজারে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল ও আদার দাম বৃদ্ধির তথ্যও উঠে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান–এর সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, রমজানের আগে প্রতিবছরই মূল্যবৃদ্ধির একই চিত্র দেখা যায়। “ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে দাম বাড়ান। সরকারের কঠোর পদক্ষেপ না থাকলে রমজানে ভোক্তাদের ভোগান্তি কমানো কঠিন হবে,” বলেন তিনি।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ–এর সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, রমজান শুরুর আগেই দাম বাড়া প্রমাণ করে বাজারে মুনাফালোভীরা সক্রিয়। “সরকার বলছে পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে—তাহলে দাম বাড়বে কেন? বাজার তদারকির দায়িত্ব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের, কিন্তু কার্যকর মনিটরিং চোখে পড়ছে না,” বলেন তিনি।
বন্দরে আটকে ৪৫ লাখ টনের বেশি পণ্য
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রমজানে বাজার স্থিতিশীল রাখতে পর্যাপ্ত পণ্য আমদানি করা হলেও চট্টগ্রাম বন্দর–এ খালাস জটিলতায় সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে শতাধিক জাহাজে ৪৫ লাখ টনের বেশি ভোগ্যপণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে—যার মধ্যে গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, ডাল, ভোজ্য তেল ও চিনি রয়েছে।
ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক নাবিল গ্রুপের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. জামশেদ আরেফিন বলেন, লাইটার জাহাজের সংকটে বন্দরে ছোলা, গম ও ডাল আটকে আছে। দ্রুত খালাস সম্ভব হলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের আমদানিতে এলসি খোলার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—সয়াবিন তেল ৩৬%, চিনি ১১%, মসুর ডাল ৮৭%, ছোলা ২৭%, মটর ডাল ২৯৪% এবং খেজুর ২৩১% বেশি। সেপ্টেম্বরে ৬.২৯ বিলিয়ন ডলার ও অক্টোবরে ৫.৬৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, ভোজ্য তেল, চিনি ও ডালের আমদানিতে শুল্ক–কর যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা হয়েছে। তবে আমদানি ও নীতিগত সুবিধার সুফল এখনো ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না—এটাই বড় প্রশ্ন।
















