ভোট ডাকাতির অভিনব কৌশল দেখে বিস্মিত প্রধান উপদেষ্টা; নথি ধ্বংসের প্রমাণ
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন কলুষিত হওয়ার পেছনে ২২টি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন। সোমবার (১৩ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি দেখে প্রধান উপদেষ্টা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, এত নির্লজ্জভাবে সিস্টেম দুমড়ে-মুচড়ে নিজেদের মনের মতো রায় লিখে দেওয়ার ঘটনা জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বাধীন এই কমিশন তিনটি নির্বাচনের পর সংশ্লিষ্ট বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য ধ্বংস করার প্রমাণ পেয়েছে। কমিশনের সদস্যরা জানিয়েছেন, নির্বাচনের নামে মূলত ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে একটি ‘ষড়যন্ত্রের জাল’ বোনা হয়েছিল, যেখানে প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রায় সব স্তরের নীতিনির্ধারকদের যুক্ত করা হয়েছিল। এমনকি তদন্তের স্বার্থে ২৩ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ এবং সাবেক সিইসি কে এম নূরুল হুদাসহ ২০ জনের বেশি ‘মাস্টারমাইন্ড’-কে জেরা করা হয়েছে।
নির্বাচন কলুষিত হওয়ার ২২টি প্রধান কারণ:
১. তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল।
২. নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশকে ব্যবহার।
৩. বিরোধী প্রার্থী ও কর্মীদের নামে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা।
৪. নেতা-কর্মীদের অজামিনযোগ্য মামলায় গ্রেপ্তার ও গুম।
৫. জাল ভোট প্রদান।
৬. নির্বাচনী কারচুপিতে নির্বাহী বিভাগকে ব্যবহার।
৭. ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো।
৮. ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের প্রবেশে বাধা।
৯. অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সংসদীয় সীমানা নির্ধারণ।
১০. আগে থেকেই ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপার ভরে রাখা।
১১. ভোট প্রদানের হারে কৃত্রিম পরিবর্তন।
১২. গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশে কড়াকড়ি।
১৩. একতরফাভাবে সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন নিয়োগ।
১৪. প্রলোভন বা ভীতি দেখিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার।
১৫. নির্বাচনের পরিসংখ্যান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করা।
১৬. নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য ধ্বংস করা।
১৭. নির্বাচনী অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না করা।
১৮. নির্বাচনে ‘ডামি প্রার্থী’ দাঁড় করানো।
১৯. বিরোধী রাজনৈতিক দলে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা।
২০. পর্যবেক্ষক নিবন্ধনে পক্ষপাতিত্ব।
২১. রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনে বৈষম্য।
২২. নির্বাচনের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে কার্যত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ ‘নির্বাচন সেল’ পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করত। কমিশন জানিয়েছে, সময় স্বল্পতার কারণে এই অপরাধে যুক্ত কয়েক হাজার কর্মকর্তার নাম সুনির্দিষ্টভাবে বের করা সম্ভব হয়নি, তবে বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে।
















