১১ জানুয়ারি ২০২৬: সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মোলিম ফিকি অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সরিয়ে সোমালিল্যান্ডে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। তিনি এই পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
শনিবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিকি বলেন, সোমালিয়ার কাছে নিশ্চিত তথ্য রয়েছে যে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের একটি পরিকল্পনা করেছে এবং তাদের সোমালিল্যান্ডে পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। তার এই মন্তব্য এমন এক প্রেক্ষাপটে এসেছে, যখন সোমালি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন যে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সোমালিল্যান্ডে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও এই অভিযোগ ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ড উভয় পক্ষই অস্বীকার করে আসছে।
সোমালিল্যান্ড ১৯৯১ সালে সোমালিয়া থেকে একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও এখনো জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়নি। তবে গত ডিসেম্বর ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেয়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
গত সপ্তাহে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার দেশটির একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেন, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সোমালিল্যান্ডে পাঠানোর বিষয়টি তাদের কোনো সমঝোতার অংশ নয়। তবে কী কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। সোমালিল্যান্ড সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রও জানিয়েছে, ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসন কোনো শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি।
এর আগে সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ আল জাজিরাকে বলেন, সোমালিল্যান্ড ইসরায়েলের তিনটি শর্ত মেনে নিয়েছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসন, আদেন উপসাগরের উপকূলে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়া।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফিকি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সোমালিল্যান্ডকে দেওয়া কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই স্বীকৃতি সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।
ফিকির অভিযোগ, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অঞ্চলকে বিভক্ত করার কৌশল অনুসরণ করছে এবং সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়াও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তার মতে, এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য ইসরায়েল বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে।
সোমালি প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, ইসরায়েল আদেন উপসাগর ও লোহিত সাগর সংযোগকারী বাব আল-মানদাব প্রণালিতে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের চেষ্টা করছে, যা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। সোমালিল্যান্ডের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে আলোচনা চলছে, যদিও শর্তসাপেক্ষে বিষয়টি নির্ধারিত হবে।
এদিকে ইয়েমেনের হুতি নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, সোমালিল্যান্ডে কোনো ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতিকে তারা হুমকি হিসেবে দেখবে এবং সেটি সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিরাহমান মোহামেদ আবদুল্লাহি বলেছেন, ইসরায়েলের স্বীকৃতি কোনো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে নয়। তবে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনা চলছে। গত সপ্তাহে সোমালিল্যান্ডের রাজধানী হারগেইসায় ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের পর ২২টি দেশ ও ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা যৌথ বিবৃতিতে এই সফরকে সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে।
শনিবার সৌদি আরবে ওআইসির ৫৭ সদস্য দেশের একটি জরুরি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দুটি প্রস্তাব গৃহীত হয়—একটিতে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানানো হয় এবং অন্যটিতে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
এদিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, তুরস্কসহ কয়েকটি মুসলিম দেশ সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরুদ্ধে সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তারা সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রাখছে।
সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সোমালিল্যান্ডের নেতাদের মোগাদিশুর সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সোমালিয়া সরকারের সম্মতি ছাড়া বিচ্ছিন্নতার পথে এগোলে সোমালিল্যান্ড আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে না এবং কূটনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়বে।
















