১০ অক্টোবর ২০২৫
বৃহস্পতিবার সকালে গাজায় আনন্দের চেয়ে ছিল অস্থিরতা। রাতভর ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধবিরতির খবর কিছু মানুষকে উল্লাসে আকাশে গুলি ছুঁড়তে উদ্বুদ্ধ করলেও, ভোরের আলো ফুটতেই ভর করেছিল আশঙ্কা।
“সবাই এখনো ভয়ে আছে,” বলেন আল-মাওয়াসির এক তরুণী,
যেখানে সমুদ্রতীরের কাদা আর ভিড় ঠাসা তাঁবুর শহরে আশ্রয় নিয়েছে লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত মানুষ।
৬৪ বছর বয়সী আব্বাস হাসসুনা বললেন, “আমরা এখনো অপেক্ষা করছি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, সীমান্ত খোলার নিশ্চয়তা, খাদ্য আনার অনুমতি আর হত্যাযজ্ঞ বন্ধের গ্যারান্টির জন্য। যখন এগুলো সত্যি ঘটবে, তখনই বিশ্বাস করব। এখনো মনে হচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে তারা আবার চুক্তি ভেঙে দিতে পারে, যেমন আগেও করেছে। তখন আবার একই দুঃস্বপ্নে ফিরে যাব।”
পুনরাবৃত্ত ভয় ও হতাশার চক্র ৪৭ বছর বয়সী ওলা আল-নাজলি জানান,
“আমি জানি না আনন্দিত হব নাকি কাঁদব। আমরা এতবার যুদ্ধবিরতির কথা শুনেছি প্রতিবারই প্রতারিত হয়েছি। তাই এবার ভয়টাই বেশি।”
গাজা সিটির ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন তিনি থাকেন আল-মাওয়াসির প্লাস্টিকের ছাউনির নিচে।
“যাদের কাজ ছিল তারা বেকার, যাদের সঞ্চয় ছিল তা শেষ। আনন্দ এখন কষ্টের সঙ্গে মিশে গেছে। আমি শুধু চাই শান্তিতে বাঁচতে, আর কোনো বোমার শব্দ শুনতে না, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পালাতে না হই,” বললেন তিনি।
মানবিক সহায়তার ঢল নামানোর প্রস্তুতি যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দ্রুত সাহায্য পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার আওতায় গাজায় “মানবিক সহায়তার ঢল নামানো” হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেডরস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেন,
“আমরা ধ্বংসস্তূপে পরিণত স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনে এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দিতে প্রস্তুত।”

ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, তাদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে যা আগামী তিন মাস গাজার ২৩ লাখ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারবে। তবে সংস্থাটির কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, “সহায়তার পরিমাণ এখনো বিপুল চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।”
গাজার বাস্তবতা:
ধ্বংসস্তূপের মাঝে আশঙ্কা আল-মাওয়াসিতে নিজের তাঁবুতে বসে রেডিওতে যুদ্ধবিরতির খবর শুনে ৩৩ বছর বয়সী জিহাদ আল-হিলু বলেন,
“মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা যেন একটু হালকা হলো। রক্তপাত থামবে, হত্যাযজ্ঞ শেষ হবে এই আশায় আমরা কতদিন বেঁচে ছিলাম।”
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কণ্ঠে ভেসে আসে উদ্বেগও “আমরা ভয় পাচ্ছি, এটা আবারও অস্থায়ী হবে। যুদ্ধবিরতির নামে শান্তি আসবে, তারপর আবার ধ্বংস ফিরে আসবে।”
৯০ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস, অবকাঠামো ধসে পড়া, ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার এই গাজায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যুদ্ধের পর শান্তি টিকবে তো?
৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই সাধারণ নাগরিক। ২০২৩ সালের হামাস হামলার পর ইসরায়েলের প্রতিশোধপর্ব গাজাকে পরিণত করেছে এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়ে।
হিলু বলেন,
“ক্ষুধা সহ্য করা যায়, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা—এটাই সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। আমি আশঙ্কা করি, যদি আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, গাজা পরিণত হবে গোষ্ঠী ও অস্ত্রধারী গ্যাংদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এক বিশৃঙ্খলার রাজ্যে।”
প্রত্যাবর্তনের আশা সকালে উত্তর গাজায় ফেরার চেষ্টা করছিলেন অনেকে, কিন্তু ইসরায়েলি ট্যাংক তাদের বাধা দেয়। কোনো বড় সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
৫৭ বছর বয়সী নাদরা হামাদেহ, যিনি যুদ্ধে নিজের বোন, ভগ্নিপতি, দুই ভাতিজি ও জামাতাকে হারিয়েছেন, বলেন “আমরা কেবল বাড়ি ফিরতে চাই। যখন গাজা ছেড়েছিলাম, মনে হয়েছিল আত্মাটাই দেহ থেকে বেরিয়ে গেছে।”
তাঁর চোখে এখন একটিমাত্র স্বপ্ন“যুদ্ধ শেষ হোক, গাজা তার মানুষদের সঙ্গে আবার দাঁড়াক। আমরা শুধু চাই, সবাই নিজের ঘরে ফিরুক, যেমনটা ছিল এই দুই বছরের বিভীষিকার আগে।”
এই যুদ্ধবিরতি গাজাকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে কিন্তু এর পরেই আসছে আরও বড় প্রশ্ন: এই শান্তি কতটা স্থায়ী হবে, আর গাজা কি সত্যিই তার পুনর্জন্ম দেখবে?
















