আন্তর্জাতিক | ০৯ অক্টোবর ২০২৫
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এক দীর্ঘ অন্ধকারের পর যেন আলো ঝলকানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা এসেছে। চুক্তিটি সফল হলে দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে|
কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শান্তির সূচনা যতটা, তার চেয়েও বেশি এক কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের সূচক।
চুক্তির প্রেক্ষাপট:
এক ক্লান্ত যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক চাপের ফল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার পর ইসরায়েল গাজায় যে নির্বিচার সামরিক অভিযান চালায়, তাতে ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। গাজা উপত্যকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, এবং এই যুদ্ধ ধীরে ধীরে আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয় লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, এমনকি ইরান ও কাতারের কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা যুদ্ধকে আন্তর্জাতিকীকরণ করে তোলে।
মার্কিন প্রশাসনের সর্বশেষ এই উদ্যোগের অধীনে, শনিবারের মধ্যেই জিম্মিদের মুক্তি ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হওয়ার কথা। একই সঙ্গে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি কাঠামোর প্রথম পর্ব কার্যকর হবে যেখানে মূল লক্ষ্য হলো গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও বন্দি-বিনিময়।


ট্রাম্পের ভূমিকা:
- কূটনীতি, না কি নির্বাচনী কৌশল? বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের এই মধ্যস্থতা একদিকে তাঁর নির্বাচন-পূর্ব কূটনৈতিক সাফল্যের প্রচেষ্টা, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা। গত এক বছরে চীন সৌদি-ইরান সমঝোতা ও রাশিয়ার মধ্যস্থতায় সিরিয়া–তুরস্ক সংলাপের পর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল।
- এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এক “কৌশলগত প্রত্যাবর্তন” হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে, ইসরায়েল ও আরব জগতে এখনো মার্কিন প্রভাব কতটা কার্যকর তা এই শান্তি প্রক্রিয়াই প্রমাণ করবে।
- ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ: সামরিক জয়ের বদলে কূটনৈতিক বেঁচে থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আজ তাঁর মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে চুক্তি অনুমোদনের ঘোষণা দিতে পারেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, “এই চুক্তি কূটনৈতিক সাফল্য, জাতীয় বিজয় এবং নৈতিক জয়।”
- কিন্তু বাস্তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। হামাস নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি, বরং সংগঠনটি ছায়া কাঠামোয় রূপ নিয়েছে যা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইসরায়েল এখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজনৈতিক সমঝোতার পথে ফিরতে বাধ্য হয়েছে।
- এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদেরও স্বস্তি মিলবে, কারণ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়াতো।
হামাসের অবস্থান:
আত্মত্যাগের প্রতীক থেকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি হামাস জানিয়েছে,
“এই চুক্তির মধ্যে সেনা প্রত্যাহার, বন্দি-বিনিময় ও জনগণের অধিকার স্বীকৃতি অন্তর্ভুক্ত।” সংগঠনটি জোর দিয়ে বলেছে, “আমাদের জনগণের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।”

এটি হামাসের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত দুই বছরের রক্তক্ষয়ের পর তারা এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সীমায় এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি এই চুক্তি সফল হয়, তবে হামাস কার্যত “ডি ফ্যাক্টো প্রশাসনিক পক্ষ” হিসেবে গাজার ভবিষ্যৎ শাসন কাঠামোয় অংশ নিতে পারে যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের জন্যই এক জটিল কৌশলগত হিসাব।
আঞ্চলিক প্রভাব:
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কূটনৈতিক ভারসাম্য চুক্তিটি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে একটি গভীর পরিবর্তন আসবে।
- মিশর ও কাতার এই আলোচনার মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে।
- ইরান সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কারণ যুদ্ধবিরতি মানে তাদের আঞ্চলিক চাপ হ্রাস, তবে কৌশলগত প্রভাব কমে যেতে পারে।
- সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত শান্তি প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছে, যা ইঙ্গিত করছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নতুন নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের উদ্যোগ কেবল জিম্মি মুক্তি নয়, বরং একটি “পোস্ট-গাজা অর্ডার” নির্মাণের প্রচেষ্টা— যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন জোট রাজনীতির ছায়া স্পষ্ট।
মানবিক দৃষ্টিকোণ:
রক্তপাতের পর আশার আলো দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে আজ মানুষ আনন্দে উল্লাস করছে। বিস্ফোরণের শব্দ থেমে গিয়ে শিশুরা আবার রাস্তায় বেরিয়েছে তাদের চোখে এখনো ভয়ের ছাপ, কিন্তু তবু আশার আলো জ্বলছে।
একজন বাসিন্দা আবদুল মাজিদ আবদ রাব্বো বললেন,
“মহান আল্লাহকে ধন্যবাদ, যুদ্ধ থেমেছে, রক্তপাত থেমেছে। আমরা আবার বাঁচতে চাই।”
এই শান্তি কতটা স্থায়ী? তবু এই শান্তির পথে বহু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে আস্থা, গাজার পুনর্গঠনের অর্থায়ন, এবং ইসরায়েলি রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভাজন।
যদি ট্রাম্পের ঘোষিত কাঠামো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য অন্যথায়, এটি ইতিহাসের আরেকটি ব্যর্থ শান্তিচেষ্টা হয়ে থাকবে।
যুদ্ধবিরতির বাইরেও যে ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজার যুদ্ধবিরতি এখন শুধুই মানবিক প্রয়োজন নয় এটি এক নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল, আরব রাষ্ট্র সবাই নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করছে।
শান্তির এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে, তা শুধু গাজার আকাশেই নয় সম্ভবত পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতেই একটি নতুন সূর্যোদয়ের ইঙ্গিত দেবে।
















