প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুতে সারা দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার পাশাপাশি গতকাল সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এক মহীয়সী নারীর বিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগের অবসান হলো।
ইতিহাসের বৃহত্তম বিদায়: স্বামীর পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বেগম খালেদা জিয়া
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে জনসমুদ্রের বিস্তৃতি কারওয়ান বাজার ও ধানমন্ডি পর্যন্ত; রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হলো বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে
বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে চিরবিদায় নিলেন অবিসংবাদিত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেলে লাখো মানুষের অশ্রুসজল নয়নে এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান নিজ হাতে প্রিয় মায়ের মরদেহ কবরে নামিয়ে দেন।
এর আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজা, যা কার্যত এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।
জনসমুদ্রে ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজা
বেলা ৩টায় শুরু হওয়া এই জানাজায় ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক। জানাজার কাতার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে উত্তরে আগারগাঁও, পশ্চিমে মোহাম্মদপুর, পূর্বে ফার্মগেট এবং দক্ষিণে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ছাড়িয়ে যায়। মোবাইল ইন্টারনেট ও লাউডস্পিকারের মাধ্যমে কয়েক কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়েও মানুষ জানাজায় শরিক হন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের জানাজার পর এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শোকযাত্রা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
তারেক রহমানের ক্ষমা প্রার্থনা
জানাজার আগে সমবেত মানুষের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ও আবেগঘন বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, “মা জীবিত থাকাকালীন তাঁর কোনো কথায় বা ব্যবহারে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা চাচ্ছি। আপনাদের কাছে যদি উনার কোনো ঋণ থাকে, আমাকে জানাবেন, আমি তা পরিশোধের দায়িত্ব নিচ্ছি।”
শ্রদ্ধা জানাতে ৩২ দেশের প্রতিনিধি
বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ে অংশ নিতে বাংলাদেশে আসেন ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৩২টি দেশের প্রতিনিধি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক সশরীরে উপস্থিত হয়ে তারেক রহমানের হাতে নিজ নিজ দেশের শোকবার্তা পৌঁছে দেন। জয়শঙ্কর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি বিশেষ বার্তাও হস্তান্তর করেন।
জানাজায় রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ
জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় সব উপদেষ্টা অংশ নেন। এ ছাড়াও তিন বাহিনীর প্রধান—সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এবং বিমান বাহিনী প্রধান রাষ্ট্রীয় অভিবাদন ও পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মরহুমার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা এক কাতারে দাঁড়িয়ে এই জানাজায় শরিক হন।
হাসপাতাল থেকে শেষ যাত্রা
২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর কারামুক্ত হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ১১৭ দিনের চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরলেও শারীরিক নানা জটিলতায় হাসপাতালের সিসিইউ-ই হয়ে উঠেছিল তাঁর শেষ জীবনের ঠিকানা। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
















