৩৭ থেকে ২০ শতাংশে নেমেছে শুল্ক; চীন-ভারতের বাজার হারানোর সুযোগে চাঙ্গা জুতা রপ্তানি
২০২৫ সালটি বিশ্ব বাণিজ্যের ইতিহাসে ছিল চরম অস্থিরতার বছর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘পাল্টা শুল্ক’ (Reciprocal Tariff) আরোপের ঘোষণায় বৈশ্বিক বাজার টালমাটাল হয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের খড়্গ আসলেও সরকারের দক্ষ কূটনৈতিক দর-কষাকষি এবং বেসরকারি খাতের তৎপরতায় তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। নজিরবিহীন এই অস্থিরতার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কেবল টিকটেই থাকেনি, বরং বছরের শেষার্ধে এসে নির্দিষ্ট কিছু খাতে প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছে।
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | বিকাল ০৪:৩০ মিনিট
শুভংকর কর্মকার | ঢাকা
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৩৭৪ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এটি গত অর্থবছরের তুলনায় ৪.৭৫ শতাংশ বেশি। অথচ আগস্টে শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে বড় ধরণের ধসের আশঙ্কা করেছিলেন বিশ্লেষকরা।
শুল্ক যুদ্ধের নাটকীয় মোড়: ৩৭ থেকে ২০ শতাংশ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে গত ২ এপ্রিল বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ বাড়তি শুল্ক বসানো হয়েছিল। এরপর কয়েক দফা স্থগিতাদেশ ও আলোচনার পর ১ আগস্ট থেকে তা কার্যকর হয়।
- কূটনৈতিক বিজয়: বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের নেতৃত্বে ইউএসটিআর-এর সঙ্গে সফল আলোচনার মাধ্যমে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় শুল্ক কমিয়ে আনা হয়।
- প্রতিযোগী দেশের চিত্র: ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ এবং মিয়ানমারের ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক থাকলেও বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামের শুল্ক ২০ শতাংশে স্থির হয়। অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য তা ছিল ১৯ শতাংশ।
তৈরি পোশাক বনাম জুতা রপ্তানি
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এলেও বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে জুতা শিল্প। চীন ও ভারতের ওপর অত্যধিক শুল্ক আরোপ হওয়ায় মার্কিনিরা বিকল্প বাজার হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে।
- চামড়াবিহীন জুতা: এই খাতে রপ্তানি বেড়েছে অভাবনীয় ২২২ শতাংশ বা তিন গুণ।
- চামড়ার জুতা: ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এই খাতটি ভবিষ্যতের বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আমদানির মাধ্যমে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক সুবিধা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে ‘বাণিজ্য-ঘাটতি’ কমানোর কৌশল নেয়।
- আমদানি চুক্তি: মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও ডেল্টা অ্যাগ্রো মিলে ১০০ কোটি ডলারের সয়াবিনবীজ আমদানির চুক্তি করেছে।
- সরকারি ক্রয়: পাঁচ বছরে ৩৫ লাখ টন গম কেনার সমঝোতা চুক্তির আওতায় ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য দেশে আসতে শুরু করেছে।
আগামীর চ্যালেঞ্জ: ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
রপ্তানিকারকরা বলছেন, ট্রাম্পের শুল্কের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের কারণে অনেক পুরোনো ক্রেতা বড় ধরণের ক্রয়াদেশ দিতে দ্বিধাগ্রস্ত। তবে চীন থেকে সরে আসা বিশাল ক্রয়াদেশের একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি বাংলাদেশ ধরতে পারে, তবে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।















