যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিন থেকেই বিচার বিভাগে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হয়। দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি প্রসিকিউটরিয়াল ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দিলেও সমালোচকদের মতে, বাস্তবে সেই সিদ্ধান্তই বিচার বিভাগকে নজিরবিহীন রাজনৈতিক রূপান্তরের পথে ঠেলে দিয়েছে।
ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার চেষ্টা করেছে। যদিও এটি নির্বাহী বিভাগের অংশ, তবু তদন্ত ও মামলা পরিচালনায় হোয়াইট হাউসের সরাসরি হস্তক্ষেপ এড়ানো ছিল দীর্ঘদিনের রীতি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, ট্রাম্প এই অলিখিত সীমারেখা ভেঙে বিচার বিভাগকে নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
স্ট্যানফোর্ড ল স্কুলের অধ্যাপক ডেভিড স্ক্ল্যানস্কির ভাষায়, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে প্রেসিডেন্টের প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের প্রচেষ্টাই ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় গল্প।
এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠ তুলেছেন বিচার বিভাগের সাবেক কর্মীরাই। ১৮ বছর দায়িত্ব পালনের পর স্টেসি ইয়াং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই পদত্যাগ করেন। তার আশঙ্কা ছিল, বিভাগের কর্মীদের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। পরে তিনি জাস্টিস কানেকশন নামে একটি নজরদারি সংস্থা গড়ে তোলেন। ইয়াং বলেন, আইনের শাসন টিকিয়ে রাখতে হলে বিচার বিভাগকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে এবং সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, প্রসিকিউটরিয়াল স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্রের আইনে স্পষ্টভাবে লেখা নেই। এটি মূলত শত বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রথা। গৃহযুদ্ধের পর ১৮৭০ সালে বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার পেছনেও ছিল রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর লক্ষ্য। তবে ইতিহাসে এই নীতির পরীক্ষা হয়েছে বহুবার।
সত্তরের দশকে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সময় বিচার বিভাগ রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। তবে নিক্সন প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর আহ্বান জানাতে সতর্ক ছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সংযম আর দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করেন স্ক্ল্যানস্কি। তার মতে, ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বিচার বিভাগকে নিজের শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের বার্তা দিচ্ছেন, যা অতীতে বিরল ছিল।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক পিটার শেন বলেন, প্রথম মেয়াদেই ট্রাম্প বিচার বিভাগকে চাপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সেই চাপ আরও স্পষ্ট ও কার্যকর হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে প্রকাশ্যে নির্দেশ দিয়ে নিজের সমালোচকদের বিরুদ্ধে মামলা করার আহ্বান জানান ট্রাম্প। এর পরপরই দুই সমালোচকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হলেও পরে তা খারিজ হয়ে যায়।
সমালোচকদের মতে, বিচার বিভাগের মূল নীতি ছিল অপরাধের বিচার করা, ব্যক্তির নয়। কিন্তু এখন রাজনৈতিক পরিচয়ই অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ধারণের ভিত্তি হয়ে উঠছে।
বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক আনুগত্য তৈরির মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র এরিক অ্যাডামসের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হলে একাধিক প্রসিকিউটর প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত আইনের ভিত্তিতে হওয়া উচিত, রাজনৈতিক কৌশলের ওপর নয়।
আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে জনবল কাঠামোতে। হাজার হাজার অরাজনৈতিক ক্যারিয়ার আইনজীবীকে বরখাস্ত করা হয়েছে, যাদের অনেকেই ট্রাম্পের অপছন্দের মামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হামলার তদন্তে যুক্ত আইনজীবীরাও রয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে অভিজ্ঞতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং বিচার বিভাগের কাজের গতি কমে গেছে।
এছাড়া ট্রাম্প তার ব্যক্তিগত আইনজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে বসানোর প্রবণতাও দেখিয়েছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি আগে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী ছিলেন। আরও কয়েকজন ব্যক্তিগত আইনজীবীকে অন্তর্বর্তী ইউএস অ্যাটর্নি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও পরে আইনি জটিলতার মুখে তাদের সরে দাঁড়াতে হয়।
সমালোচকরা বলছেন, এসব পরিবর্তনের ফলে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত এক বছরে একাধিক বিচারক আদালতে সরকারের আইনজীবীদের বক্তব্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কখনও সত্য গোপন, কখনও ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিচার ব্যবস্থা ক্রমেই দলীয় স্বার্থে পরিচালিত একটি ব্যবস্থায় পরিণত হবে। এতে শুধু বিচার বিভাগ নয়, পুরো আদালত ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হতে পারে। স্ক্ল্যানস্কির ভাষায়, আদর্শগত বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একসঙ্গে বসবাসের যে ব্যবস্থা বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
















