গত ১১ মাসে গণপিটুনিতে নিহত ১৮৪; বিচারহীনতা ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় বেপরোয়া মব সন্ত্রাস
বাংলাদেশে গত ১৬ মাস ধরে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির নামে এক ভয়াবহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চুরি, ছিনতাই কিংবা তুচ্ছ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এখন চরম সীমায়। চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই সারা দেশে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৪ জন, যার বড় অংশই খোদ রাজধানী ঢাকার। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রহস্যময় নিষ্ক্রিয়তা এই বর্বরতাকে উসকে দিচ্ছে।
২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | দুপুর ০২:৪৫ মিনিট
অনলাইন ডেস্ক | ঢাকা
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশে গণপিটুনির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার নৃশংস চিত্র এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
মৃত্যুর মিছিল: পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত পৌনে আট বছরে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৫৪৭ জন। তবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এই হার কয়েক গুণ বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১৮৪ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ঢাকাতেই প্রাণ গেছে ৭২ জনের। এছাড়া চট্টগ্রামে ২৮, খুলনায় ১৭ এবং বরিশালে ১৪ জন মব সন্ত্রাসের বলি হয়েছেন।
স্তব্ধ করা কয়েকটি হত্যাকাণ্ড
- ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস হত্যা: ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ তুলে পোশাকশ্রমিক দিপুকে পিটিয়ে হত্যার পর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ধর্ম অবমাননার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বরং কারখানার সহকর্মীদের সাথে দ্বন্দ্বে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়।
- ঢাবির তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ড: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক তোফাজ্জলকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও এই মামলার চার্জশিট এখনো জমা পড়েনি, যা বিচারব্যবস্থার ধীরগতিকে আঙুল দিয়ে দেখায়।
- মিটফোর্ড ও তারাগঞ্জের নৃশংসতা: রাজধানীর মিটফোর্ডে ব্যবসায়ী সোহাগকে বিবস্ত্র করে পিটিয়ে হত্যা এবং রংপুরে হরিদাস সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তিকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে মারার ঘটনাগুলো মানবিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল আসামিরা জামিনে বেরিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
কেন থামছে না এই বর্বরতা?
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত তিনটি কারণে মব সন্ত্রাস থামছে না: ১. আইনের প্রতি আস্থাহীনতা: সাধারণ মানুষ মনে করছে অপরাধীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাবে, তাই নিজেরাই তাৎক্ষণিক বিচার করতে উদ্যত হচ্ছে। ২. গুজবের বিস্তার: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের ভিত্তিতে মুহূর্তেই উত্তেজিত জনতা হিংস্র হয়ে উঠছে। ৩. পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা: অনেক ক্ষেত্রে চোখের সামনে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও পুলিশকে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।
মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ
বিচারের বাণী যখন নিভৃতে কাঁদে, তখন সমাজ আরও সহিংস হয়ে ওঠে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এসব হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে বাংলাদেশ এক ভয়ংকর অরাজকতার দিকে ধাবিত হবে। বিশেষ করে আদালত প্রাঙ্গণেও যখন সাবেক মন্ত্রী-বিচারপতিরা মারধরের শিকার হন, তখন আইনের শাসনের কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্ব মহলে প্রশ্ন উঠছে।
















