থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়ার সীমান্তে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা প্রমাণ করছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিরোধ এখনো কতটা অস্থিতিশীল। আসিয়ান সম্মেলনে দুই দেশের নেতারা যুদ্ধবিরতির যে কাঠামোতে সম্মত হয়েছিলেন, সেটিকে তখন কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি অঞ্চলটি নিজস্ব উদ্যোগে সংকট সামাল দিতে পারবে—এমন বার্তাই দিয়েছিল।
কিন্তু সম্মেলন শেষ হওয়ার পরপরই সেই আশার বুদবুদ ফেটে যায়। বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় থাইল্যান্ডের বিমান হামলার পরই ব্যাপকভাবে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, এই বিরোধে যুদ্ধবিরতি প্রায়ই কেবল সাময়িক বিরতি হয়ে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতির মূল দুর্বলতা ছিল এটি সংঘাতের মূল কারণগুলো স্পর্শ করেনি। সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে পুরোনো দ্বন্দ্ব, ঐতিহাসিক দাবি এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস থেকেই গেছে। কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি হলেও বাস্তব সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রয়ে গেছে।
আসিয়ান কাঠামোর আওতায় শত্রুতা বন্ধ, সেনা চলাচল স্থগিত এবং ভারী অস্ত্র প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয় আসিয়ানকে। কিন্তু বাস্তবে এই নজরদারি কার্যকর করতে যে গভীর সামরিক সহযোগিতা দরকার, তা দুই দেশের মধ্যে নেই বললেই চলে।
আরেকটি বড় কারণ হলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। ব্যাংকক ও নম পেন—উভয় রাজধানীতেই নেতারা জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে দুর্বলতার অভিযোগে পড়তে চান না। জাতীয়তাবাদী আবেগ সহজেই উসকে ওঠে, ফলে অনেক সময় আগেভাগেই শক্ত অবস্থান নিতে বাধ্য হন তারা।
এই সীমান্ত বিরোধের শিকড় রয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের অস্পষ্ট সীমারেখায়। ফরাসি শাসনামলে নির্ধারিত সীমান্তে বহু জায়গায় দ্ব্যর্থতা থেকে যায়। প্রেয়াহ ভিহেয়ার মন্দিরসহ কয়েকটি এলাকা সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশের কাছেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। ১৯৬২ সালে আন্তর্জাতিক আদালত মন্দিরটি কাম্বোডিয়ার অংশ বলে রায় দিলেও বিরোধ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
২০০৮ থেকে ২০১১ সালের সংঘর্ষ এই ইস্যুকে দুই দেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। চলতি বছরের সহিংসতাও সেই পুরোনো ধারাবাহিকতারই অংশ। সামরিক আধুনিকীকরণ ও সীমান্তে সেনাদের ঘন উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসিয়ান যদি সত্যিই কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায়, তবে কেবল বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। সীমান্ত এলাকায় পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন ও স্বচ্ছ নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি থাইল্যান্ড, কাম্বোডিয়া ও আসিয়ানের বর্তমান সভাপতিকে নিয়ে একটি স্থায়ী সংকট ব্যবস্থাপনা কাঠামো গঠন জরুরি, যা দ্রুত কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ করতে পারবে।
দীর্ঘমেয়াদে সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে কাঠামোবদ্ধ আলোচনার বিকল্প নেই। এই প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীলও বটে, তবে আলোচনাহীন পরিস্থিতির চেয়ে এটি অনেক ভালো।
জাতিসংঘ চাইলে আসিয়ানের উদ্যোগকে কারিগরি সহায়তা দিতে পারে, বিশেষ করে সীমান্ত নির্ধারণ ও মানবিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। তবে শেষ পর্যন্ত শান্তি টেকাতে হলে ব্যাংকক ও নম পেনের রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই কঠিন ও অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির ভেঙে পড়া শুধু আরেকটি সংঘাত নয়, বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো এখনো অসম্পূর্ণ। কার্যকর নজরদারি, স্পষ্ট নিয়ম এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রয়োগ ব্যবস্থা ছাড়া ভবিষ্যতেও এমন চুক্তি বারবার ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
















