সুদানের রাজধানী খার্তুমে গৃহযুদ্ধ চলাকালে বাধ্য হয়ে বাড়ির আঙিনা, রাস্তা কিংবা খোলা জায়গায় দাফন করা মরদেহগুলো এখন কবরস্থানগুলোতে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়া বহু পরিবারের জন্য আবারও ফিরে আনছে প্রিয়জন হারানোর গভীর শোক ও স্মৃতি।
খার্তুম নর্থ এলাকায় বসবাসকারী ইমান আবদেল আজিম জানান, সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের তীব্র সংঘর্ষের সময় তিনি তার ভাইকে নিজ বাড়ির উঠোনে দাফন করতে বাধ্য হন। নিরাপত্তাহীনতা ও চলাচলের ঝুঁকির কারণে তখন কবরস্থানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তার মতো খার্তুম, খার্তুম নর্থ ও ওমদুরমানের বহু বাসিন্দাই একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন।
ডিসেম্বরের শুরুতে খার্তুম রাজ্য কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে সেগুলো কবরস্থানে পুনরায় দাফনের একটি বড় কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই ঘোষণার পর থেকেই ইমানের মতো অনেকের পুরনো ক্ষত আবারও তাজা হয়ে উঠছে।
এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে গঠন করা হয়েছে রাষ্ট্র ও স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক কমিটি। এতে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, সিভিল ডিফেন্স, সুদানিজ রেড ক্রিসেন্ট এবং পাড়া-মহল্লার ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রতিনিধিরা যুক্ত রয়েছেন। খার্তুম নর্থের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ আবদেল রহমান জানান, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য পরিবারগুলোর মানসিক চাপ কমানো এবং রাজধানীর স্বাস্থ্য ও মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়ন।
তিনি বলেন, ‘ব্যাটল অব ডিগনিটি’ চলাকালে নিহতদের মরদেহ সংগ্রহ ও পুনর্দাফনের জন্য গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির তত্ত্বাবধানে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম ধাপে অস্থায়ী কবরগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করা হচ্ছে। এরপর পরিবারগুলোকে জানানো হয় এবং উত্তোলন থেকে দাফন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে একজন প্রতিনিধিকে উপস্থিত থাকার সুযোগ দেওয়া হয়।
খার্তুম রাজ্যের ফরেনসিক মেডিসিন কর্তৃপক্ষের পরিচালক হিশাম জাইন আল-আবিদিন জানান, সেনাবাহিনী খার্তুমের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই ধাপে ধাপে মরদেহ স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়েছে। তার আশা, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের মধ্যে খার্তুম ও এর সাতটি জেলা অস্থায়ী কবরমুক্ত হবে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, কাজটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। মরদেহ বহনের ব্যাগের সংকটসহ বিভিন্ন লজিস্টিক সমস্যার কারণে কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি আরএসএফ বাহিনীর দ্বারা ডিএনএ সংরক্ষণ ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক মরদেহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শনাক্ত করা না গেলে সেগুলো আলাদা করে নথিভুক্ত করে অজ্ঞাত কবরস্থানে দাফন করা হচ্ছে।
খার্তুম নর্থের শাম্বাত এলাকার স্টিয়ারিং ও সার্ভিসেস কমিটির সহসভাপতি শিরিন আল-তাইয়েব নূর আল-দায়েম জানান, চিকিৎসা দল আসার আগে তাদের কমিটি মসজিদ, বাড়িঘর ও খোলা জায়গায় থাকা কবরগুলোর তালিকা তৈরি করেছে। পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পুরো প্রক্রিয়ায় আইনগত ও চিকিৎসা দিকগুলো নিশ্চিত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবার বা প্রতিনিধির উপস্থিতি ছাড়া কোনো মরদেহ উত্তোলন বন্ধ রাখার নির্দেশ রয়েছে। এই কাজ দেশ পুনর্গঠনের পথ তৈরি করছে, যদিও অনেক পরিবারকে প্রিয়জনকে আবারও বিদায় জানাতে হচ্ছে, যা মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর।
এদিকে, খার্তুমের রাস্তাঘাটে এখনও এমন অনেক মরদেহ পড়ে আছে, যেগুলো দাফন করা হয়নি এবং কিছু ইতোমধ্যে পচে গেছে। এগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই বাস্তবতায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত রাজধানীতে স্বাভাবিক জীবন ফেরাতে মরদেহ স্থানান্তরের এই উদ্যোগকে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, যদিও তা বহু পরিবারের পুরনো দুঃখকে নতুন করে জাগিয়ে তুলছে।
















