বাংলাদেশ–চীন–পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ ঘিরে প্রশ্ন—দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কি ভারতকে পাশ কাটিয়ে নতুন আঞ্চলিক জোটে যুক্ত হবে?
পাকিস্তান উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। কিন্তু ভারতকে বাদ দিয়ে এ জোট কতটা বাস্তবসম্মত? বিশ্লেষকরা বলছেন, আঞ্চলিক উত্তেজনা, সার্কের অচলাবস্থা ও ভারতের প্রভাব এই উদ্যোগের বড় বাধা।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সার্কের স্থবিরতা এবং ভারত–পাকিস্তানের দীর্ঘ বৈরিতার মধ্যেই পাকিস্তান নতুন এক আঞ্চলিক জোট গঠনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ও চীনের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা বিস্তারের ধারণা তুলে ধরে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন—ইসলামাবাদ এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো চায়, যেখানে ভারত নিয়ন্ত্রক শক্তি নয়, বরং সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হবে অন্য রাষ্ট্রগুলো।
ইসলামাবাদে এক অনুষ্ঠানে দার বলেন, একতরফা সুবিধাভোগী আঞ্চলিক বৃত্ত পাকিস্তান চায় না। তার ভাষায়, “জাতীয় উন্নয়নকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের কাছে জিম্মি রেখে চলতে পারি না। কার কথা বলছি, তা আপনারা জানেন।”
চীন–পাকিস্তান–বাংলাদেশের জুনের বৈঠককে কেন্দ্র করেই এ ধারণা আরও জোরালো হয়েছে। তখন কূটনীতিকরা দাবি করেছিলেন, এই সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবে এটি ভারতকে পাশ কাটানোরই ইঙ্গিত।
গত বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং শেখ হাসিনার ভারত আশ্রয়ে যাওয়ার পর ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েনও এ আঞ্চলিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশ্লেষকদের চোখে সম্ভাবনা ও বাধা
ইউনিভার্সিটি অব লাহোরের সিএসএসপিআর-এর পরিচালক রাবিয়া আক্তার মনে করেন—পাকিস্তানের এই ভাবনা আকাঙ্ক্ষার বেশি, বাস্তবতার কম। সার্ক অচল, আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে, আর ভারতের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় রেখে অনেক দেশই সতর্ক থাকবে।
তার মতে, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ ও ভুটান—যোগাযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন বা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়ে প্রাথমিক আগ্রহ দেখালেও আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দিতে ইতস্তত বোধ করবে।
আরও এগিয়ে এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ফারওয়া আমের বলেন, বহুপাক্ষিক কাঠামোর বদলে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কই ভবিষ্যতের দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিকে এগিয়ে নেবে। কারণ এতে ফল পাওয়া দ্রুত এবং প্রণোদনাও বেশি থাকে।
তিনি মনে করেন, চীন ও পশ্চিমা দেশ—দুই অক্ষে সম্পর্ক মজবুত করায় পাকিস্তান এখন কূটনৈতিকভাবে বেশ আত্মবিশ্বাসী। ফলে অঞ্চল নিয়ে বড় ভূমিকায় নিজেদের দেখতে চাচ্ছে ইসলামাবাদ।
তাহলে জোট কি কার্যকর হবে?
বিশ্লেষকরা দ্বিধাহীনভাবে বলছেন—বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতায় ভারতকে বাদ দিয়ে বড় কোনো জোট গঠন করা খুবই কঠিন।
ভারতের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, বাণিজ্যিক প্রভাব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে প্রভাবশালী ভূমিকা—এ সবকিছু মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লিকে পাশ কাটিয়ে স্থায়ী কোনো জোট গঠন এখন প্রায় অসম্ভব।
তবে পাকিস্তানের জোট-চিন্তা দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতির নতুন পথরেখা আঁকছে—এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। ভবিষ্যতে ছোট পরিসরের বহু ত্রিপাক্ষিক সহযোগিতাই হয়তো এই অঞ্চলের নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে।
















