গাজার আকাশে যেন বারবার ফিরে আসে ধোঁয়ার কুয়াশা, আর মাটির নিচে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস ভেসে ওঠে বাতাসে। এমন এক মুহূর্তে মিসর, কাতারসহ আটটি মুসলিম প্রধান দেশ ইসরায়েলের এক নতুন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, রাফাহ সীমান্তকে শুধুমাত্র “বহির্গমন পথ” হিসেবে খুলে দেওয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের জন্মভূমি থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করা হবে।
এই দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্ত যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের শামিল। তারা জানিয়েছে, একটি পথ দিয়ে শুধু বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে, কিন্তু ফিরে আসার অধিকার কেড়ে নেওয়া মানবিক ন্যায়বোধের ওপর আঘাত। একই সঙ্গে এই উদ্যোগের ফলে গাজায় ত্রাণ প্রবেশও কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
তাদের বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুদ্ধবিরতির পরও গাজার ওপর হামলা থামেনি। গত সাত সপ্তাহে প্রায় ছয় শতাধিকবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ হামলায় উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় তিনজন নিহত হন, যখন একটি পরিবার নিজেদের ধ্বংসপ্রাপ্ত খামার দেখতে গিয়েছিল।
ইসরায়েলের সামরিক দপ্তর সিওগ্যাট বুধবার ঘোষণা দেয়, মিসরের সঙ্গে সমন্বয় করে “নিরাপত্তা অনুমোদনের” ভিত্তিতে রাফাহ সীমান্ত শুধু বাইরে যাওয়ার জন্য খোলা হবে। তবে মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই উদ্যোগকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা স্পষ্ট জানায়, ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের ভূমি থেকে উৎখাত করার যেকোনো প্রচেষ্টা তারা সহ্য করবে না।
তারা আরও দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে রাফাহ সীমান্ত উভয় দিকে খোলা রাখার কথা বলা হয়েছে। তাদের আশা, একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রযুক্তিবিদ-নির্ভর ফিলিস্তিনি সরকার গঠিত হবে এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে শান্তির একটি কাঠামো গড়ে উঠবে।
দোহায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফোরামে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানী বলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি এখনো সম্পূর্ণ নয়, এটি একটি সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তার ভাষায়, ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার না হলে গাজায় প্রকৃত শান্তি ফিরবে না।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানান, একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলমান, যার উদ্দেশ্য হবে সীমান্তে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের পৃথক রাখা।
অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও গাজায় হামলার আগুন থামেনি। বেইত লাহিয়ায় ড্রোন হামলায় তিনজন নিহত হন। গাজা শহর, মাঘাজি শরণার্থী শিবির এবং রাফাহে অন্তত ২০টি বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। খান ইউনিস ও রাফাহর পূর্বাঞ্চলে ট্যাংক ও কামানের গোলাবর্ষণ চলে। সমুদ্রপথে খান ইউনিস উপকূলে ফিলিস্তিনি জেলেদের নৌকায় গুলিবর্ষণ করা হয়।
এখনও গাজার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল, এবং উত্তর গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। মোট ভূখণ্ডের অর্ধেকের বেশি এলাকাজুড়ে তাদের উপস্থিতি রয়েছে।
এই দীর্ঘ রক্তাক্ত অধ্যায়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লক্ষ সত্তর হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। গাজার আকাশে আজও ভেসে বেড়াচ্ছে ধূলার সঙ্গে মিশে থাকা মানুষের কান্না, আর ভূমির বুকে জমে আছে ঘরহারা শেকড়ের অস্ফুট আহ্বান।
















