দুই প্রাচীন প্রতিবেশীর মাঝখানে সীমান্তরেখা যেন আবার রক্তে ভিজে উঠল। আফগানিস্তান জানিয়েছে, পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তীব্র গোলাবিনিময়ের ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে এক তালেবান সদস্যও রয়েছেন। ব্যর্থ হওয়া শান্তি আলোচনার পর এই সহিংসতা নতুন করে দুই দেশের সম্পর্কের উপর ছায়া ফেলেছে।
কান্দাহারের স্পিন বোলদাক জেলার গভর্নর শনিবার জানান, সংঘর্ষে চারজন বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। পরে তালেবানের উপ-প্রবক্তা হামদুল্লাহ ফিতরাও নিশ্চিত করেন, পাকিস্তানের গোলাবর্ষণে মোট পাঁচজন নিহত হয়েছে।
দুই পক্ষই একে অপরকে প্রথম গুলি চালানোর জন্য দায়ী করেছে। তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, পাকিস্তানি বাহিনী স্পিন বোলদাক লক্ষ্য করে হামলা চালায়, যার জবাবে আফগান বাহিনী প্রতিরোধ করে। বিপরীতে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দপ্তর দাবি করেছে, আফগান বাহিনীই সীমান্তে উসকানিমূলক গুলি চালিয়েছে।
সীমান্তের আফগান অংশের বাসিন্দারা জানান, শুক্রবার রাত প্রায় সাড়ে দশটার দিকে গোলাগুলির শুরু হয় এবং প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে। কান্দাহারের তথ্য বিভাগের প্রধান আলী মোহাম্মদ হাকমাল জানান, পাকিস্তানি বাহিনী হালকা ও ভারী গোলন্দাজ অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালায়, মর্টারের গোলা আঘাত হানে বেসামরিক ঘরবাড়িতে। পরে উভয় পক্ষ সংঘর্ষ বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে বলে তিনি জানান।
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ইসলামাবাদ ও কাবুলের সম্পর্ক তিক্ত হতে শুরু করে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আফগানিস্তান পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে। টিটিপি ২০০৭ সাল থেকে পাকিস্তানে রক্তাক্ত হামলা চালিয়ে আসছে এবং সম্প্রতি সীমান্তের কাছে এক বোমা হামলায় তিনজন পাকিস্তানি পুলিশ নিহত হয়।
পাকিস্তান আরও অভিযোগ করে, আফগানিস্তান বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি ও আইএসকেপি নামের আইএস–সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে, যদিও আফগান তালেবান এ সব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায় তারা বহন করতে পারে না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
অক্টোবরে দুই দেশের সীমান্তে এক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে প্রায় ৭০ জন নিহত হন এবং শত শত মানুষ আহত হন। পরে কাতারের দোহায় যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর হয়। কিন্তু কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরবে ধারাবাহিক আলোচনার পরও স্থায়ী শান্তির ভিত্তি গড়ে ওঠেনি।
সর্বশেষ সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত আলোচনাতেও কোনো বড় অগ্রগতি হয়নি, যদিও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দুই পক্ষ। এর মধ্যেও কাবুল অভিযোগ করেছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তান একের পর এক বিমান হামলা চালিয়েছে।
নভেম্বরের শেষ দিকে খোস্ত প্রদেশে একটি বাড়িতে হামলার ঘটনায় নয় শিশু ও এক নারী নিহত হন বলে আফগানিস্তান দাবি করলেও পাকিস্তান তা অস্বীকার করেছে। এই পাহাড়ি সীমান্তে এখনো রক্ত, ধোঁয়া আর অবিশ্বাসের ছায়া জমে আছে, যেখানে প্রতিটি রাতই যেন নতুন কোনো কান্নার প্রতীক্ষা।
















