মহাবিশ্বের গভীরতম অন্ধকারে, সময়ের সিঁড়ি বেয়ে ১২ বিলিয়ন বছর পেছনে তাকিয়ে, ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেলেন এক বিস্ময়—মিল্কিওয়ের মতোই গড়ন, সৌন্দর্য আর শৃঙ্খলায় ভরা এক প্রাচীন গ্যালাক্সি। যখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল মাত্র দেড় বিলিয়ন বছর, তখনই সে জন্ম নিয়েছিল; যেন অন্ধকার শিশুকালেই পরিণত এক বিশাল নক্ষত্রবাড়ি।
এই আবিষ্কার আমাদের পুরোনো ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এত প্রাচীন সময়ের গ্যালাক্সিগুলো ছোট, অগোছালো আর বিশৃঙ্খল হয় বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে মনে করে এসেছেন। কিন্তু পুণের এনসিআরএ–টিফরের গবেষক রাশি জৈন ও অধ্যাপক যোগেশ ওয়াদাদেকর যখন জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের চোখ দিয়ে অতীতে তাকালেন, তখন তাঁরা দেখলেন এক পূর্ণাঙ্গ, সূক্ষ্মভাবে গড়া সর্পিল গ্যালাক্সি—এক মহাজাগতিক চাকা, মহাজাগতিক শিল্পীর নিখুঁত তুলির ছোঁয়া।
গ্যালাক্সিটির নাম রাখা হয়েছে আলকানন্দা—হিমালয়ের নদীর মতোই শান্ত অথচ অসীম। নাসা, ইউরোপীয় ও কানাডিয়ান মহাকাশ সংস্থার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ১০ বিলিয়ন ডলারের জেমস ওয়েব টেলিস্কোপই এই অলৌকিক দৃশ্য মানবজাতিকে উপহার দিয়েছে।
রাশি জৈন জানান, ৭০ হাজার আকাশীয় বস্তু পর্যবেক্ষণ করতে করতে হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করেন একমাত্র ঐ বস্তুটি—এক বড়সড় সর্পিল গ্যালাক্সি, যার ব্যাস প্রায় ৩০ হাজার আলোকবর্ষ। এর দুটি সুশৃঙ্খল বাহু কেন্দ্রের উজ্জ্বল অংশকে আলতোভাবে জড়িয়ে আছে, যেন মহাশূন্যের বুকে এক নক্ষত্রমালা-মণ্ডিত নৃত্য।
অধ্যাপক ওয়াদাদেকর প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, “বিগ ব্যাং–এর মাত্র কয়েক শ’ মিলিয়ন বছরের মধ্যেই ১০ বিলিয়ন সৌর ভরের নক্ষত্র তৈরি করে এমন বৃহৎ সর্পিল গ্যালাক্সির জন্ম—এ এক বিস্ময়কর গতি।”
বহু বছর ধরে ধরা হয় আসল মহাবিশ্বের ভোর—কসমিক ডন—ছিল বিশৃঙ্খল, আর গ্যালাক্সিগুলো ছিল ছোট ও কম ভরবিশিষ্ট। কিন্তু আলকানন্দা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি মিল্কিওয়ের এক-তৃতীয়াংশ আকারের, কিন্তু গর্ভে ধারণ করেছে প্রায় ১০ বিলিয়ন তারা। নক্ষত্র তৈরির হারও আমাদের গ্যালাক্সির তুলনায় ২০ থেকে ৩০ গুণ বেশি।
জেমস ওয়েবের আবির্ভাবের পর থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা খুঁজে চলেছেন আরও দূরের গ্যালাক্সি। প্রথমদিকে অনেকগুলোই ছিল লালচে দাগ বা অস্পষ্ট ছাপ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামনে এসেছে উন্নততর গঠন—সর্পিল গ্যালাক্সিও তার মধ্যে অন্যতম। আর আলকানন্দা প্রমাণ করছে, মহাবিশ্ব তার প্রারম্ভেই ছিল আমাদের কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি সৃজনশীল।
তবুও এর বর্তমান রূপ কী—এ প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ আমরা যা দেখছি, তা ১২ বিলিয়ন বছর আগের আলো। অধ্যাপক ওয়াদাদেকর হাসতে হাসতে বলেন, “এখন ও কোথায় আছে জানতে চাইলে আর ১২ বিলিয়ন বছর অপেক্ষা করতে হবে।”
গবেষকরা এখন চাচ্ছেন জেমস ওয়েব কিংবা চিলির আলমা অবজারভেটরিতে ফলো-আপ পর্যবেক্ষণ করতে, যাতে জানা যায় কীভাবে এত দ্রুত, এত নিখুঁত সর্পিল বাহু তৈরি হলো। কারণ মহাবিশ্বের অতীতেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের চাবিকাঠি—তারার জন্মের গল্প, গ্যালাক্সির বিকাশ, আর মানুষের অনন্ত কৌতূহলের উত্তর।
















