দামেস্কের শান্ত ভোর আজ আবারও রক্তে রঞ্জিত। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষায়, ইসরায়েলি বাহিনীর নতুন এক হামলা যেন ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে বেইত জিন্ন শহরতলির নিস্তব্ধ সকালকে। অন্তত ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন—এদের মধ্যে দুই শিশু ছিল অশান্ত আকাশের নিষ্পাপ শিকার।
ইসরায়েলের ভোরের আক্রমণে যখন ঘুম ভেঙে যায় বেইত জিন্নবাসীর, তখন ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে দেখেন—কুয়াশার মতো ছড়িয়ে থাকা ধোঁয়ার মাঝেই ট্যাংক ও সশস্ত্র বাহিনীর ছায়া। গোলার শব্দে কেঁপে ওঠে ঘরবাড়ি, আর জীবন বাঁচাতে বহু পরিবার ছুটে যায় আশ্রয়ের খোঁজে।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই আক্রমণকে বলেছে “ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর নৃশংস অপরাধ”—একটি “পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ”। দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা জানায়, নিহত পাঁচজনের মরদেহ—যাদের মধ্যে দুই শিশু—নিয়ে যাওয়া হয়েছে কুনেইত্রার গোলান ন্যাশনাল হাসপাতালে। আকাশে তখনও ঘুরে বেড়াচ্ছিল ইসরায়েলি ড্রোনের তীক্ষ্ণ নজর।
সিরিয়ান সিভিল ডিফেন্স জানায়, শহরটিতে এখনো প্রবেশ করা যাচ্ছে না। চেষ্টামাত্রই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে উদ্ধারকর্মীরা। স্থানীয়রা বলছে, এলাকায় কোনো লড়াকু গোষ্ঠী নেই, নেই হেজবোল্লাহ কিংবা অন্য কোনো মিলিশিয়ার উপস্থিতি—শুধু কৃষক আর রাখালদের জীবনযাপন। তাদের ওপর এই হামলা এসেছে অকস্মাৎ ঝড়ের মতো।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের ছয়জন সৈন্য আহত হয়েছে সংঘর্ষে, এবং অভিযান শেষ হলেও তারা “কোনো সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধে” এখনো মোতায়েন রয়েছে।
সিরিয়ার যুবক ইয়ার দাহের জানান, ভোররাতে গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে বেরিয়েই দেখেন গ্রামে ইসরায়েলি সৈন্য আর ট্যাংকের উপস্থিতি। কিছু সময় পরেই তারা সরে গেলে আকাশভরা গর্জন নিয়ে আসে যুদ্ধবিমান, আর চারপাশ ভরে ওঠে গোলার আগুনে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, বেইত জিন্নে প্রবেশ করা একটি ইসরায়েলি কমান্ডো দল ঘেরাও হয়ে পড়েছিল, আর তাদের উদ্ধারে বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ চালানো হয়—যাতে বহু সিরিয়ানের মৃত্যু ঘটে।
ইসরায়েল গত এক বছরে দক্ষিণ সিরিয়ার আরও অধিক অঞ্চল দখল করে বসেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ পতনের পর থেকে সামরিক অভিযান আরও তীব্র হয়েছে। কুনেইত্রা ও দামেস্ক গ্রামাঞ্চল প্রায় প্রতিদিনই ভোগে আক্রমণ, অপহরণ আর টহলের ভার।
অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল এই হামলাগুলোর কোনো ব্যাখ্যা দিতে প্রয়োজন মনে করে না। তাদের কাছে এটি “নিরাপত্তা অভিযান”, আর সিরিয়ার কাছে এটি দখল ও সন্ত্রাসের নতুন অধ্যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্তে যেকোনো অস্থিরতাই ইসরায়েলের কাছে সামরিক আগ্রাসনের অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৬৭ সালে দখল করা গোলান উচ্চভূমি থেকে শুরু করে নতুন করে গড়ে তোলা ‘বাফার জোন’—সবই যেন একটি দীর্ঘমেয়াদি দখল-কৌশলের অংশ।
এই হামলার মধ্যে দিয়ে যখন সিরিয়ার নতুন সরকার ২০২৪ সালের দ্রুত বিদ্রোহের বার্ষিকী পালন করছে, তখন দেশের জনজীবন আবারও দাঁড়িয়ে গেছে ভয়, শোক ও অস্থিরতার কিনারায়। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের আর্তনাদ যেন আকাশ ভেঙে ওঠা গোলার শব্দকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।
















