কাজাখস্তানে আজ আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন শুরু হয়েছে। নতুন এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের এই ভোটকে প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভের ক্ষমতা আরও সুসংহত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির নতুন সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে এবার ১৪৫ আসনের কুরুলতাই নির্বাচিত হবে।
নতুন ব্যবস্থায় পার্লামেন্টের দুই কক্ষের পরিবর্তে এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা চালু করা হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলকে সরকার গঠনের জন্য মোট ভোটের অন্তত ৫ শতাংশ পেতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরাও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন।
এবার সাতটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সদ্য গঠিত আদিলেত দল, আউইল, আক জোল, কাজাখস্তানের পিপলস পার্টি, ন্যাশনাল সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাইতাক ও রেসপুবলিকা। দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী আমানাত দল নিজেদের বিলুপ্ত করে নতুন আদিলেত দলের সঙ্গে একীভূত হয়েছে। এর মাধ্যমে সাবেক প্রেসিডেন্ট নুরসুলতান নাজারবায়েভের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
আদিলেত দল ‘ন্যায়ভিত্তিক কাজাখস্তান’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিবারগুলোর আয় বাড়ানো, অর্থনীতি শক্তিশালী করা, সরকারি সেবা উন্নত করা, অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও ডিজিটাল ব্যবস্থা জোরদারের কথা বলছে। অন্যদিকে আক জোল উদ্যোক্তাদের সহায়তা, আউইল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং বাইতাক পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পার্লামেন্টে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা সীমিত। তোকায়েভের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত দলগুলোই উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই নির্বাচন মূলত সাবেক প্রেসিডেন্ট নাজারবায়েভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুরোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সরিয়ে তোকায়েভের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি করবে।
তোকায়েভ ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের জন্য একবারের সাত বছরের মেয়াদ নির্ধারণ করা হলেও বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন নিয়ম অনুযায়ী তিনি আরও একবার সাত বছরের মেয়াদে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন।
নির্বাচনের গুরুত্ব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়া ও চীনের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে থাকা দেশটি নিজেকে মধ্য এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে কাজাখস্তান তুলনামূলক নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দেশটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও নিজের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও কাজাখস্তানের গুরুত্ব বাড়ছে। দেশটি তেলসমৃদ্ধ এবং বিশ্বের দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় ২ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। ইউরোপে তেল রপ্তানির বড় অংশ রাশিয়ার একটি বন্দর হয়ে যায়। ফলে আঞ্চলিক সংঘাত ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা দেশটির অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৩৩৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন কাজাখস্তানের নতুন এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা কতটা কার্যকর হবে এবং তোকায়েভের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবে কতটা এগোবে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একই সঙ্গে রাশিয়া, চীন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রেখে দেশটি ভবিষ্যতে কতটা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে পারে, সেটিও এই নির্বাচনের অন্যতম বড় প্রশ্ন।
















