প্রায় ৩০ বছর ধরে মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ার কাছে একটি পাথরের নিচে বরফের মধ্যে পড়ে আছে একটি মরদেহ। পায়ে থাকা সবুজ রঙের পর্বতারোহণের বুটের কারণে মরদেহটি ‘গ্রিন বুটস’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
ধারণা করা হয়, মরদেহটি ১৯৯৬ সালে এভারেস্টে মারা যাওয়া ভারতীয় পর্বতারোহী দোর্জে মোরুপের। দীর্ঘদিন ধরে এভারেস্টে ওঠার পথে অনেক পর্বতারোহীর জন্য মরদেহটি একটি ভয়ংকর চিহ্ন হয়ে ছিল। এভারেস্টে পড়ে থাকা শত শত মরদেহের মধ্যে এটি সবচেয়ে পরিচিত মরদেহগুলোর একটি বলে মনে করা হয়।
এখন ভারত বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি উদ্ধারকারী দল খুঁজছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন অভিযানের মাধ্যমে মোরুপের মরদেহ উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে চায় দেশটি। ভারত আশা করছে, মরদেহটি উদ্ধার করে মোরুপের পরিবার ও স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। প্রায় ৩০ বছর পরও তার পরিবার তার ফিরে আসার আশা ছাড়েনি।
মোরুপের স্ত্রী কঞ্চাক ইয়াংস্কিট বিবিসিকে বলেন, অনেক রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি ভাবতেন, হয়তো দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হবে।
দরজা খুললে তিনি দেখবেন, তার স্বামীই ফিরে এসেছেন।
তিনি বলেন, ‘সে যখন বাড়ি ফিরবে, আমি তাকে জিজ্ঞেস করব, এত বছর তুমি কোথায় ছিলে?’ এভারেস্টে একটি ঐতিহাসিক ভারতীয় অভিযানে অংশ নেওয়ার আগে মোরুপ লাদাখে নিজের বাড়িতে স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন। অভিযানে রওনা হওয়ার আগের রাতে তিনি স্ত্রীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি বীরের মতো ফিরে আসবেন এবং দেশের জন্য গর্ব বয়ে আনবেন।
মোরুপের স্ত্রী কঞ্চাক ইয়াংস্কিট বিবিসিকে বলেন, ‘তিনি আমাকে সন্তানদের দেখাশোনা করতে এবং ফিরে আসার পর বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে বলেছিলেন।’
৪৮ বছর বয়সী মোরুপ ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) ল্যান্স নায়েক ছিলেন।চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্তের বড় একটি অংশের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এই বাহিনীর সদস্য হিসেবে তিনি হিমালয়ে ট্রেকিং ও পর্বতারোহণে অভ্যস্ত ছিলেন। তবে সেদিন রাতে ইয়াংস্কিটের মনে অজানা এক আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম, আমি কি তাকে আর কখনো দেখতে পাব?’ মোরুপ ছিলেন আইটিবিপির ছয় সদস্যের একটি পর্বতারোহী দলের সদস্য। দলটি এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করছিল।
নেপাল ও চীন-নিয়ন্ত্রিত তিব্বত অঞ্চলের সীমান্তে অবস্থিত এভারেস্টে সাধারণত বেশির ভাগ পর্বতারোহী নেপালের দিক দিয়ে আরোহণ করেন। কিন্তু মোরুপের দলটি চীনের দিক থেকে এভারেস্টে ওঠার পরিকল্পনা করেছিল। দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ চীনা দিক দিয়ে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করা প্রথম ভারতীয় অভিযাত্রী দল হিসেবে ইতিহাস গড়তে চেয়েছিল তারা।
অভিযাত্রী দলের ছয় সদস্যের মধ্যে তিনজন তুষারঝড়ের কারণে ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু মোরুপ এবং অন্য দুজন সেওয়াং স্মানলা ও সেওয়াং পালজোর সংগ্রাম চালিয়ে যান এবং আট হাজার ৮৪৯ মিটার উঁচু চূড়া পর্যন্ত আরোহণ করেন। তারা যখন নিচে নামছিলেন, তখন এক ভয়াবহ তুষারঝড় আঘাত হানে এবং তিনজনই মারা যান। এক শতাব্দী আগে নথিভুক্তিকরণ শুরু হওয়ার পর থেকে এভারেস্ট অঞ্চলে মারা যাওয়া ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের মতো, তাদের অনেকের মৃতদেহও পর্বতেই রয়ে গেছে।
দুইজনের মৃতদেহ কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি, কিন্তু তৃতীয় মৃতদেহটি ‘গ্রিন বুটস’ এর মৃতদেহ। আট হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায় তিন দশক ধরে বরফের মধ্যে জমে আছে। বহু বছর ধরে ধারণা করা হতো, ‘গ্রিন বুটস’ ছিলেন অভিযাত্রী দলেরই আরেক সদস্য, সেওয়াং পালজোর। কিন্তু ১৯৯৬ সালের অভিযাত্রী দলের জীবিত সদস্যদের সাক্ষ্য এবং পর্বতারোহীদের সঙ্গে শেষ রেডিও যোগাযোগের স্থান এখন কর্তৃপক্ষকে এই বিশ্বাস করতে পরিচালিত করেছে যে দেহাবশেষটি মোরুপের।
গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আইটিবিপি কর্মকর্তা বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোরুপের পোশাক ও পর্বতারোহণের সরঞ্জাম দেখে কর্মকর্তারা মরদেহটি শনাক্ত করতে সক্ষম হন।
এরপর থেকেই মোরুপের মরদেহ বাড়িতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছিল আইটিবিপি। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করে পরিবারের সদস্যদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দেওয়াই ছিল তাদের লক্ষ্য। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা তাকে কখনো ভুলিনি। তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল।’
মৃতদেহ উদ্ধার করা কতটা কঠিন?
এভারেস্টে মারা যাওয়া পর্বতারোহীদের মরদেহ উদ্ধার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন কাজ। গত এক দশকের আগ পর্যন্ত এ ধরনের মরদেহ উদ্ধার খুবই বিরল ছিল। মোরুপের মরদেহের মতো অনেক মরদেহই এভারেস্টের ‘ডেথ জোন’ বা মৃত্যু অঞ্চলে পড়ে আছে। সেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় ওই এলাকায় অক্সিজেনের পরিমাণও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
নেপালের অভিজ্ঞ পর্বতারোহী তশিরিং জাংবু শেরপা বলেন, আবহাওয়া ও তুষারের পরিস্থিতি এ অভিযানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। তিনি বিবিসি হিন্দিকে বলেন, ‘উত্তর দিকের পথে ফাটল বা গভীর বরফের গর্ত কম। তবে এই পথ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। নেপালের দিক থেকে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা সম্ভব। কিন্তু চীনের দিক থেকে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই।’
বিবিসি নিউজ নেপালিকে কয়েকজন শেরপা জানান, গ্রিন বুটসের মরদেহ এভারেস্টের চীনা অংশে রয়েছে। এই অংশটি দক্ষিণ দিকের তুলনায় বেশি খাড়া এবং এখানে নেপালের দিকের মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা ও উদ্ধার অবকাঠামো নেই। এটিও মরদেহ উদ্ধারের কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
পর্বতারোহণের গাইড পেম্বা ওংচু শেরপা বলেন, ‘জনপ্রিয় বসন্ত মৌসুমেও মরদেহটি নিচে নামানো খুব কঠিন। সেখানে শরৎকালে কাজটি আরো কঠিন, কারণ ওই সময় আবহাওয়া বেশি অনিশ্চিত থাকে। এত বছর ধরে মরদেহটি সেখানেই পড়ে থাকার এটাই মূল কারণ।’
তিনি বলেন, ‘ওই জায়গা পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য সহায়ক দড়ি স্থাপন করতেই চূড়ায় ওঠার সক্ষমতা আছে এমন ১০ থেকে ১২ জন পর্বতারোহীর প্রয়োজন হবে।’ গ্রিন বুটসের মরদেহকে শারীরিকভাবে বহন করে এমন উচ্চতায় নামিয়ে আনতে হবে, যেখানে সেটি হেলিকপ্টার বা সম্ভব হলে ইয়াকের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া যাবে। এরপর মরদেহটি বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে হবে। পুরো কাজের জন্য বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রয়োজন হবে।
শেরপারা জানান, বরফে জমে শক্ত হয়ে যাওয়া পর্বতারোহণের পোশাকে ঢাকা মরদেহগুলো সাধারণ মানুষের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ভারী হতে পারে। অনেক সময় মরদেহগুলো অস্বাভাবিক অবস্থায় বরফের সঙ্গে জমে থাকে। ফলে দুর্গম ও খাড়া পথ দিয়ে সেগুলো নিচে নামানো আরো বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এ ছাড়া মরদেহগুলো নিচু উচ্চতায় নামানোর পর বরফ গলতে শুরু করলে পচনও ধরতে পারে।
ভারতীয় পর্বতারোহী কুনতাল জোইশার বিবিসি নেপালিকে বলেন, মরদেহ নিয়ে নিচে নামার শুরুতেই সবচেয়ে বেশি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অভিযান হবে। জায়গাটি খুবই খাড়া এবং সেখানে প্রচুর পাথর রয়েছে। প্রথম এক হাজার মিটার নিচে নামানোই হবে বিশাল এক চ্যালেঞ্জ।’
তিনি আরো বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য কোনোভাবেই শেরপাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা উচিত নয়।’
‘আমার মন মানতে চায়নি যে সে মারা গেছে’
মোরুপ নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে লাদাখে থাকা তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই ঘটনা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছে। এখন প্রায় ৭৫ বছর বয়সী ইয়াংস্কিটের নিজের বিয়ের দিনটির কথাও ঠিকমতো মনে নেই। তবে সেই দুঃখজনক ঘটনার পরের দিনগুলোর স্মৃতি এখনো তার মনে স্পষ্ট হয়ে আছে।
চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু জানতাম, পাহাড়ে একটি ঝড় হয়েছিল। বাড়িতে আমরা তার আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা ও শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা করেছিলাম। কিন্তু আমার মন মানতে চায়নি যে সে মারা গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি তার মরদেহ দেখিনি। তাই তার মৃত্যু হয়েছে, এটা বিশ্বাস করা আমার জন্য খুব কঠিন ছিল।’
মোরুপের স্মৃতি হিসেবে এখন পরিবারের কাছে রয়েছে তার পদক ও ট্রফি, পর্বতারোহণের সময় তোলা কয়েকটি পুরোনো ছবি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সনদপত্র। চীন সরকারের দেওয়া ওই সনদপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের ১০ মে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে মোরুপ এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন।
মোরুপের ছেলে পুঞ্চোক দোরজাই বিবিসিকে বলেন, উদ্ধার অভিযান সফল হলে লাদাখের রাজধানী লেহের শহীদ উদ্যানে তার বাবার শেষকৃত্যের আয়োজন করবে পরিবার। দোরজাই বলেন, ‘আমার বাবা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। তাকে শহীদ হিসেবে স্মরণ করা উচিত।’ তিনি আরো বলেন, মোরুপের নিহত সতীর্থরাও একই মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য।
তিনি জানান, মোরুপের স্মৃতিকে পরিবারের বাড়িতে সংরক্ষণ করা হবে। এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার সনদপত্রের পাশেই তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক রাখা হবে। দোরজাই বলেন, ‘আমরা ‘গ্রিন বুটস’ সংরক্ষণ করে রাখার পরিকল্পনা করছি।’















