গোয়েন্দা গল্পে হানিট্র্যাপ খুব পরিচিত বিষয়। প্রতিপক্ষের সংবেদনশীল তথ্য, পরিকল্পনা, গতিবিধি জানতে লেলিয়ে দেওয়া হয় সুন্দরীদের।
তারা টার্গেট ব্যক্তিকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে তথ্য আদায় করে নেয়। এ নিয়ে অনেক নাটক, সিনেমা, গল্প লেখা হয়েছে। তেমন এক ফাঁদে পড়েছেন ভারতীয় বিমান বাহিনীর এক কর্মকর্তা।
সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা তথ্য ফাঁসের অভিযোগে দিল্লি পুলিশ ভারতীয় বিমান বাহিনীর এক উইং কমান্ডারকে গ্রেপ্তার করেছে।
তার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-এর অধীনে মামলা করা হয়েছে।
ভারতীয় বিমান বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩১ মে রাতে অভিযান চালিয়ে দিল্লি পুলিশ ওই উইং কমান্ডারকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর প্রথমে তাকে পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পরে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়।
বর্তমানে ওই কর্মকর্তা তিহার জেলে বন্দি রয়েছেন। গত ৩০ জুলাই তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। আজ শনিবার ভারতীয় বিমান বাহিনী এবং দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। তদন্তের স্বার্থে এবং জাতীয় সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে দুই মাস তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল।
দিল্লি পুলিশের ধারণা, এই ঘটনাটি কেবল একজন কর্মকর্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কৌশলগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার একটি বড় গুপ্তচর নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারেন।
তদন্তের সঙ্গে জড়িত পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ব্যক্তিগত জীবনের এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় ওই উইং কমান্ডার সোশ্যাল মিডিয়ায় এক নারীর সঙ্গে চ্যাট করা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাদের এই কথোপকথন নিয়মিত ভিডিও কলে রূপ নেয়।
পুলিশ জানায়, ওই নারী প্রথমে তার বিশ্বাস অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে সামরিক কার্যক্রম সংক্রান্ত তথ্য চাইতে শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে যে, ওই কর্মকর্তা সামরিক ইউনিটের চলাচল, মোতায়েন এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্যের বিবরণ সেই নারীর সঙ্গে শেয়ার করেছিলেন। পুলিশের সন্দেহ, ওই নারী পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন এবং ওই কর্মকর্তা ‘হানি ট্র্যাপ’-এর শিকার হয়েছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই নারী ওই কর্মকর্তাকে সামরিক ইউনিটের চলাচল ও মোতায়েন সম্পর্কিত ছবি, ভিডিও এবং অন্যান্য বিবরণ শেয়ার করতে বলেছিলেন। আরো অভিযোগ রয়েছে যে, ওই কর্মকর্তা ডিজিটাল মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য সেই নারীকে পাঠিয়েছিলেন। ঠিক কতটুকু সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হয়েছে এবং তা কী উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।
তদন্তের সময় আরো একটি গুরুতর দিক সামনে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই নারী নাকি উইং কমান্ডারকে তার সহকর্মীর মোবাইল ফোনে একটি নির্দিষ্ট অ্যাপ ইনস্টল করতে বলেছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, অ্যাপটি কোনো স্পাইওয়্যার বা রিমোট-অ্যাক্সেস ম্যালওয়্যার হতে পারে। এই ধরনের সফটওয়্যার মোবাইল ডেটা চুরি, লোকেশন ট্র্যাক বা কথোপকথন রেকর্ড করতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
তদন্তকারীদের মতে, এই মামলাটি কেবল একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অন্যান্য প্রতিরক্ষা কর্মীদের মোবাইল ফোন এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত তথ্যে প্রবেশাধিকার পাওয়ারও একটি চেষ্টা ছিল এটি।
দিল্লি পুলিশের সন্দেহ, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিমান বাহিনীর ওই কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা নারীকে পাকিস্তানভিত্তিক অপারেটিভরা পরিচালনা করছিল। তদন্তকারী সংস্থাগুলো এখন এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তি এবং বিদেশ থেকে যারা এটি পরিচালনা করছিলেন তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে।
এ মামলার তদন্তের মূল ফোকাস ছিল ডিজিটাল ট্রেইলের ওপর। পুলিশ জানার চেষ্টা করছে যে, ওই কর্মকর্তা এবং নারী কোন কোন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছিলেন, কতটুকু তথ্য শেয়ার করা হয়েছিল এবং কার কাছে সেই তথ্য পাঠানো হয়েছিল। এর পাশাপাশি কথিত বিদেশি হ্যান্ডলারদেরও চিহ্নিত করার কাজ করছে সংস্থাগুলো।
















