দক্ষিণ কোরিয়া দূতাবাসের সেমিনার
ভূরাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে বাংলাদেশ: ঝুঁকি এড়াতে স্বাধীন অবস্থান জরুরি
ঢাকা, ১০ নভেম্বর ২০২৫: পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা, সামরিকীকরণ এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এমন এক প্রেক্ষাপটে নিজের স্বার্থের নিরিখে ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি এবং স্বাধীন অবস্থান নেওয়া বাঞ্ছনীয়। গতকাল রোববার ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক ভূরাজনীতি বিষয়ক সেমিনারে বিশ্লেষকেরা এমন অভিমত দিয়েছেন।
ঢাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাস ‘নেভিগেটিং জিওপলিটিক্যাল ডায়নামিকস: টুওয়ার্ডস আ কোরিয়া-বাংলাদেশ ফিউচার পার্টনারশিপ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে।
মূল ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জসমূহ:
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব এখন সামরিকীকরণের দিকে এগোচ্ছে এবং নিয়মতান্ত্রিক বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়া থেকে সরে যাচ্ছে। এছাড়া, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘শুল্কযুদ্ধ’ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে পর্যুদস্ত করে তুলেছে।
- সংঘাতের ঝুঁকি: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ূন কবির বলেন, বাংলাদেশ বড় শক্তিগুলোর রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে পড়তে পারে এবং আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র–চীন শুল্কযুদ্ধের পাশাপাশি ভারত–পাকিস্তান ও পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্ভাব্য সংঘাতের প্রসঙ্গ টানেন।
- অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ: হুমায়ূন কবির বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোতে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের উত্থান দেখা যাচ্ছে। পাল্টাপাল্টি শুল্ক তারই প্রতিফলন, যা বিশ্ববাণিজ্য ও বহুপাক্ষিকতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
- গণতান্ত্রিক রূপান্তর: হুমায়ূন কবির আরও বলেন, সারা বিশ্ব বাংলাদেশের সংস্কারপ্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে এবং সবাই চায় বাংলাদেশ একটি উদার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হোক। গণতান্ত্রিক রূপান্তর কতটা সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তার ওপর দেশের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে। তিনি সতর্ক করেন যে বিভাজনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।
শুল্কযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, বৈশ্বিকভাবে বহুপক্ষীয় নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে।
- ব্যবসায়িক সংকট: তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়িক সংকট বাড়ছে, সঙ্গে যোগ হয়েছে মার্কিন পাল্টাপাল্টি শুল্ক, যা পুরো বিশ্বকে ভুগতে বাধ্য করছে।
- উত্তরণের উপায়: এমন পরিস্থিতিতে তিনি সহজ পণ্য উৎপাদন থেকে সরে এসে জটিল পণ্য উৎপাদনে জোর দিয়েছেন।
কোরিয়া-বাংলাদেশ অংশীদারত্বের সুযোগ:
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী মার্কিন সিনেটে পাস হওয়া ‘থিংক টোয়াইস অ্যাক্ট’ প্রসঙ্গে আলোচনা করেন। এই বিলের লক্ষ্য হলো চীন থেকে অস্ত্র কেনা থেকে তৃতীয় দেশগুলোকে নিরুৎসাহিত করা এবং মার্কিন অস্ত্রের বিক্রি বাড়ানো।
- বিকল্প উৎস: অধ্যাপক আব্বাসী বলেন, এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে দক্ষিণ কোরিয়া একটি বিকল্প উৎস হতে পারে। তিনি ঢাকা–সিউলকে সেমিকন্ডাক্টর ও প্রতিরক্ষা খাতে একসঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত পার্ক ইয়ং-সিক বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ অংশীদার এবং তারা শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নয়, আঞ্চলিক সহযোগিতাও বাড়াতে চায়। তিনি বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক সোবহান সেমিনারের শুরুতে সূচনা বক্তব্য দেন। এতে আরও অংশ নেন দক্ষিণ কোরিয়ায় দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি সং কিউংজিন, সাবেক রাষ্ট্রদূত মোস্তাফিজুর রহমান এবং এয়ারপোর্ট ইন্ডাস্ট্রি টেকনোলজি রিসার্চ ইনিস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট সং চি-উং।
















