চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) বাংলাদেশ যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের অর্থ পেয়েছে, তার প্রায় পুরোটা চলে গেছে অতীতের নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান হিসেবে মোট ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার পাওয়া গেছে।বিপরীতে আগের নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রাপ্ত অর্থের প্রায় ৮৯.২৮ শতাংশই ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে হাতে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৪৪ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ এবার নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই বিদেশি ঋণদাতা সংস্থা ও দেশগুলোর কাছে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৫০ হাজার ৫১৫ কোটি। এটি দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ঋণের সুদ ও আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৪৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পরিশোধ বেড়েছে ৩৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার বা প্রায় চার হাজার ৮৪০ কোটি টাকা।
ঋণ পরিশোধের এই চাপ বৃদ্ধির পেছনে গত এক দশকে নেওয়া বড় বড় অবকাঠামো ও মেগাপ্রকল্পের ঋণকে প্রধান কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এসব ঋণের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে ঋণের আসল পরিশোধ করা হয়েছে ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৩৮ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অন্যদিকে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের ১৪০ কোটি ১২ লাখ ৪০ হাজার ডলারের তুলনায় বেশি।
একদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে কমেছে নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি।চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ৪২২ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের ঋণ ও অনুদান প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। ফলে প্রতিশ্রুতি কমেছে ১২৬ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। সবচেয়ে বেশি কমেছে অনুদান। চলতি অর্থবছরে অনুদান প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৮ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
ঋণের অর্থছাড়েও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে অর্থছাড় হয়েছে ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০৩ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ডলার কম। গত অর্থবছরের একই সময়ে অর্থছাড়ের পরিমাণ ছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
ইআরডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক, প্রায় ৯৬ কোটি ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া, যারা দিয়েছে প্রায় ৯৩ কোটি ডলার। এরপর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৭৮ কোটি ডলার, চীন ৫৩ কোটি ডলার, ভারত ২৫ কোটি ডলার ও জাপান ৪৩ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেছে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার বা ৪৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে নতুন ঋণের অর্থ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের পরিবর্তে ক্রমশ পুরনো ঋণ পরিশোধেই বেশি ব্যয় হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং একই সঙ্গে পরিশোধের চাপ বাড়া—এই দ্বৈত চাপে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা আরো সতর্কভাবে করতে হবে। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থছাড়ের গতি না বাড়লে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ঋণ বাড়ছে, সেই সঙ্গে পরিশোধও বাড়ছে। আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ বেড়ে পাঁচ-ছয় বিলিয়ন ডলার হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে আমরা রাজস্ব আদায় যদি বাড়াতে না পারি এবং বৈদেশিক মুদ্রার জোগানও যদি না বাড়ে, তাহলে ঋণ পরিশোধের চাপে অর্থনীতিতে দুর্দশা নেমে আসতে পারে। তাই ঋণগুলোর ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ ব্যবহার করে রিটার্ন যাতে সময়মতো পাওয়া যায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।’
















