বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক সংকটের কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এখনও অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি সত্তর জন মানুষের মধ্যে একজন বর্তমানে নিজ বাসস্থান থেকে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবনযাপন করছেন।
বর্তমানে প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ বিভিন্ন কারণে নিজ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী, নিজ দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষ।
তবে এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের মোট সংখ্যা কিছুটা কমেছে। এর প্রধান কারণ হলো বিপুলসংখ্যক মানুষের নিজ দেশে বা নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়া। গত বছরে প্রায় দেড় কোটি মানুষ নিজভূমিতে ফিরে গেছেন, যা এ পর্যন্ত নথিভুক্ত সর্বোচ্চ প্রত্যাবর্তনের ঘটনা।
ফিরে যাওয়া মানুষের মধ্যে অধিকাংশই নিজ দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত ছিলেন। পাশাপাশি লাখ লাখ শরণার্থীও দীর্ঘদিন পর নিজ দেশে ফিরেছেন। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ পুরোপুরি নিরাপদ বা স্থিতিশীল নয়। অনেকেই ধ্বংসস্তূপ, অর্থনৈতিক সংকট, অনিরাপত্তা এবং সীমিত সেবার মধ্যেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি শরণার্থী নিজ দেশে ফিরেছেন মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, মধ্যপ্রাচ্যের একটি দীর্ঘ সংঘাতপীড়িত দেশ এবং আফ্রিকার কয়েকটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্রে। এসব দেশে প্রত্যাবর্তনের পেছনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির আংশিক উন্নতির পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর কঠোর নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এক নারী, যিনি দীর্ঘদিন বিদেশে আশ্রিত ছিলেন, জানান নিজের দেশে ফিরে আসা আনন্দের হলেও বাস্তবতা ছিল অত্যন্ত কঠিন। বহু বছর পর ফিরে এসে তিনি দেখেছেন, বসতবাড়ি, জীবনযাত্রা এবং সামাজিক পরিবেশ সবকিছুই বদলে গেছে। নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তাকে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
অন্যদিকে এক যুদ্ধপীড়িত আফ্রিকান দেশের নারী বলেন, গোলাগুলি, ভয় এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর পরিবারসহ নিজ এলাকায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তারা। তবে যুদ্ধের স্মৃতি এখনও তাদের জীবনে গভীর প্রভাব রেখে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজভূমিতে প্রত্যাবর্তন মানবিক সংকট সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও কেবল ফিরে যাওয়াই যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত না হলে অনেক মানুষ আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বিশ্বব্যাপী চলমান সংঘাত ও জলবায়ুজনিত সংকটের কারণে বাস্তুচ্যুতি এখনও একটি বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। তবে নিজভূমিতে ফিরে নতুন জীবন গড়ার আকাঙ্ক্ষা লাখো মানুষের মধ্যে এখনও শক্তিশালী হয়ে রয়েছে।
















