নেপালের উত্তর-পশ্চিম পার্বত্য অঞ্চলের একটি ছোট্ট গ্রাম এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। শতাব্দীপ্রাচীন বন ধর্ম অনুসরণকারী এই জনপদে বন্যা, ভূমিক্ষয় এবং পানির সংকট শুধু মানুষের জীবনযাপনই নয়, তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
হিমালয়ের দুর্গম উপত্যকায় অবস্থিত গ্রামটি বহু প্রজন্ম ধরে বন ধর্মের অনুসারীদের আবাসস্থল। স্থানীয়দের বিশ্বাস, তাদের পূর্বপুরুষরা শত শত বছর আগে এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং সেই সময় থেকে ধর্মীয় আচার, রীতি ও সামাজিক কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
কিন্তু গত এক দশকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে। বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ বন্যা নিয়মিত আঘাত হানছে। বহু পরিবার তাদের পূর্বপুরুষদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে ফলের বাগান এবং খাদ্যশস্যের ক্ষেত।
স্থানীয়দের মতে, আগে শীতকালে প্রচুর তুষারপাত হতো। বর্তমানে তুষারপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলেও হঠাৎ অতি ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা পাহাড়ি ঢাল থেকে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পলি নামিয়ে এনে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করছে।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা বাড়ছে। অতিবৃষ্টি, ভূমিক্ষয় এবং নদীতে পলির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পার্বত্য এলাকার ভূপ্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এর ফলে বন্যার ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দারা জানান, একসময় যে জমিতে ফসল উৎপাদন হতো, সেখানে এখন কেবল কাদা ও পাথরের স্তূপ দেখা যায়। পানির সংকটও তীব্র হয়েছে। হিমবাহ গলনের পানি সংরক্ষণ করে যে ঐতিহ্যবাহী সেচব্যবস্থা পরিচালিত হতো, সেটিও এখন ঝুঁকির মুখে।
এদিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলিও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। শতাব্দীপ্রাচীন মঠ, প্রার্থনাস্থল এবং ধ্যানগুহাগুলো অতিবৃষ্টি ও ভূমিক্ষয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী কাদামাটির নির্মাণশৈলী পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না।
স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা বলছেন, তাদের সংস্কৃতি ও ধর্ম প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পাহাড়, নদী, গুহা ও প্রাকৃতিক উপাদানকে ঘিরেই বহু ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার গড়ে উঠেছে। তাই পরিবেশের পরিবর্তন শুধু ভৌত ক্ষতিই নয়, সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবুও স্থানীয়রা আশা ছাড়ছেন না। নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষা, ধর্মীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। ধর্মীয় নেতাদের বিশ্বাস, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাদের প্রাচীন ঐতিহ্য টিকে থাকবে।
















