যুক্তরাজ্যের অন্যতম খ্যাতনামা শিল্প, মানবিক ও সমাজবিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গোল্ডস্মিথস বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে গভীর সংকটের মুখে। ব্যাপক চাকরি ছাঁটাই ও পুনর্গঠন পরিকল্পনার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তারা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির চলমান পরিস্থিতি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নয়, বরং পুরো ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে নতুন পুনর্গঠন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই পরিকল্পনার ফলে কর্মরত জনবলের পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও বেশি কর্মী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। গত পাঁচ বছরে এটি তৃতীয় পুনর্গঠন উদ্যোগ, এবং প্রতিবারই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষক ও কর্মচারীরা মূল্যায়ন ও পরীক্ষার কাজ বর্জন করেন। এর জবাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অংশগ্রহণকারী কর্মীদের শতভাগ বেতন কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে শ্রমিক সংগঠন অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয়।
বর্তমান সংকটের সূত্রপাত কয়েক বছর আগে। মহামারির পর আর্থিক পুনরুদ্ধারের নামে প্রথম পুনর্গঠন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। তখন একাধিক বিভাগে চাকরি কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। আন্দোলনের মুখে কিছুটা পরিবর্তন এলেও কর্মীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
এরপর ব্যাংকের সঙ্গে আর্থিক চুক্তি এবং প্রশাসনিক কাঠামো কেন্দ্রীয়করণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ শিক্ষার্থী ও কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়। একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষক সংগঠন।
তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে বিভিন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, আইনি সেবা ও নিয়োগ সংস্থার পেছনে কোটি কোটি পাউন্ড ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ গেছে একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছে।
২০২৩ ও ২০২৪ সালে দ্বিতীয় দফা পুনর্গঠন কর্মসূচিতে আরও শতাধিক পদ বিলুপ্তির পরিকল্পনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত কয়েক ডজন কর্মী চাকরি হারান এবং বহু বিভাগে কার্যক্রম সংকুচিত করা হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমানে ঘোষিত নতুন কর্মসূচিকে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। সমালোচকদের প্রশ্ন, আগের পুনর্গঠনগুলো থেকে সাশ্রয় হওয়া অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের জবাবদিহি কেন নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গোল্ডস্মিথসের সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা বাজারভিত্তিক নীতির ফল। সরকারি অর্থায়ন কমিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমশ শিক্ষার্থীদের ফি এবং প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে।
গত দুই দশকে ধাপে ধাপে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক সংকটে পড়েছে। শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, যেখানে বড় ও ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সুবিধা পেলেও অনেক প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে পড়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় একই ধরনের সংকটে রয়েছে। কোথাও শত শত কর্মী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে আছেন, কোথাও বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও পুরো ক্যাম্পাস কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিল্প, সাহিত্য ও মানবিক শিক্ষার বিষয়গুলোও সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। কারণ এসব বিষয়ে স্নাতকদের সম্ভাব্য আয়কে অনেক সময় আর্থিক মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে জ্ঞানচর্চার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়াও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে। উচ্চশিক্ষা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় আগামী শিক্ষাবর্ষে ঘাটতির মুখে পড়তে পারে। এমনকি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তন করা সম্ভব। উচ্চশিক্ষাকে জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করে পর্যাপ্ত সরকারি অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। একই সঙ্গে কর্মী ছাঁটাই ও বিভাগ বন্ধের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষাবিদেরা।
ধর্মঘটরত শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার মূল শক্তি তার শিক্ষক, গবেষক ও কর্মীরা। তাদের স্বার্থ রক্ষা এবং মানসম্মত শিক্ষা অব্যাহত রাখার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানো সম্ভব। তাদের মতে, গোল্ডস্মিথসকে রক্ষা করার লড়াই আসলে পুরো যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে রক্ষা করার বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ।
















