মার্কিন রাজনীতির নাটকীয় মঞ্চে এক নতুন অধ্যায়—নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির জয় শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, এক প্রতীকী বিদ্রোহও। কিন্তু সেই জয়ের ছায়াতেই ভাসছে নতুন এক প্রশ্ন—ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সত্যিই নিউইয়র্কের ফেডারেল তহবিল বন্ধ করতে পারেন?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই তরুণ মুসলিম বংশোদ্ভূত নেতাকে আখ্যা দিয়েছেন “কমিউনিস্ট” হিসেবে, এবং নির্বাচনের আগেই হুমকি দিয়েছিলেন—যদি মামদানি মেয়র নির্বাচিত হন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম নগরীকে তিনি “এক টাকাও অতিরিক্ত” দেবেন না।
“যদি কমিউনিস্ট প্রার্থী মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র হন, তবে এই শহর ধ্বংসের মুখে পড়বে,” লিখেছিলেন ট্রাম্প নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্টে। তাঁর দাবি—একজন অভিজ্ঞ ডেমোক্র্যাট জয়ী হলেও তিনি খুশি হতেন, কিন্তু “একজন ব্যর্থ কমিউনিস্ট” নেতৃত্বে নিউইয়র্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
অন্যদিকে মামদানি বলেছেন, তিনি সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট নন। উগান্ডা থেকে আগত মুসলিম মার্কিন নাগরিক এই রাজনীতিকের স্বপ্ন—বাসযোগ্য নিউইয়র্ক, যেখানে ভাড়ার লাগাম টানবে সরকার, শিশুদের জন্য থাকবে বিনামূল্যের ডে-কেয়ার, এবং গণপরিবহনে সবার অধিকার থাকবে সমানভাবে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও স্বীকার করছেন এই সত্য। সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো, যিনি নিজেই মামদানির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, বলেন, “তিনি কমিউনিস্ট নন, বরং একজন সমাজতন্ত্রী—তবে আমাদের শহর হয়তো এমন মেয়র চায় না।”
অর্থনীতির প্রশ্নে বিষয়টি আরও জটিল। নিউইয়র্ক সিটি ২০২৬ অর্থবছরে প্রায় ৭.৪ বিলিয়ন ডলার ফেডারেল তহবিল পাবে, যা পুরো বাজেটের প্রায় ৬.৪ শতাংশ। এই অর্থ মূলত যায় আবাসন, সামাজিক সেবা এবং দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান স্পষ্ট—ফেডারেল অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নয়, কংগ্রেসের। সংবিধানের অনুচ্ছেদ I এর ৮ ও ৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো অর্থ কেবল আইনের ভিত্তিতে ব্যয় করা যাবে। অর্থাৎ ট্রাম্প যদি নিজ ইচ্ছায় অর্থ আটকে দেন, তা হবে অসাংবিধানিক “ইমপাউন্ডমেন্ট”।
১৯৭৪ সালে পাস হওয়া ‘ইমপাউন্ডমেন্ট কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ এই ইস্যুতেই জন্ম নেয়—রিচার্ড নিক্সনের তহবিল আটকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঠেকাতে। আইনটি প্রেসিডেন্টকে মাত্র ৪৫ দিনের জন্য অর্থ স্থগিত রাখার ক্ষমতা দেয়, তবে তার পর তা কংগ্রেসের অনুমোদনেই কার্যকর হতে পারে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্রুস ফেইন আল জাজিরাকে বলেন, “ট্রাম্প আইনি ভাবে কোনো রাজ্যের তহবিল বন্ধ করতে পারবেন না, যদি না কংগ্রেস সেই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে এবং সেটি অর্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়।” তিনি আরও যোগ করেন, “যে সংস্থা বা শহরের অর্থ কাটা হবে, তারা আদালতে মামলা করার অধিকার রাখে।”
তবুও ট্রাম্প প্রশাসনের আগেও এমন পদক্ষেপের নজির আছে। সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের আমলে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটির (এমটিএ) ১২ মিলিয়ন ডলারের একটি ফেডারেল অনুদান বন্ধ করে দিয়েছিল ওয়াশিংটন। পরবর্তীতে রাজ্য সরকার সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করে।
নিউইয়র্ক স্টেট কম্পট্রোলার টমাস ডি’নাপোলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতোমধ্যে শহরকে শত কোটি ডলারের তহবিল কাটছাঁট বা স্থগিতের নোটিশ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে আগামী অর্থবছরে প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন ডলার কমে যেতে পারে।
তবুও নিউইয়র্কের প্রাণচঞ্চল রাস্তাগুলোতে এই মুহূর্তে আর্থিক হুমকির চেয়ে বড় আলোচ্য—এক মুসলিম সমাজতন্ত্রী মেয়রের জয়, যিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন “অহংকারের সামনে মাথা নত না করার”।
রাজনীতির এই লড়াই তাই শুধু ক্ষমতার নয়—এটি এক বিশ্বাসের লড়াই, যেখানে ট্রাম্পের হুমকি যেন নিউইয়র্কের রাতের আকাশে মিলিয়ে যাওয়া এক পুরনো প্রতিধ্বনি, আর মামদানির জয়—এক নতুন ভোরের সূচনা।
















