চাহিদা কমাতে সরকারের ৪ পদক্ষেপ; দীর্ঘমেয়াদী সংকটের শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রবাদে দেশের জ্বালানি সংকট এখন জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। আমদানিনির্ভর এই খাতের অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতির অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ খাত সরাসরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সরবরাহ বৃদ্ধির চেয়ে ‘চাহিদা কমানো’র নীতিতে হাঁটছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সোমবার (৬ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি পরিবহনের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ এই সংকটে পড়েছে। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৬৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়, যার বড় অংশই ডিজেল। সরবরাহ সংকটের কারণে পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল সংগ্রহ নিয়ে গ্রাহক ও মালিকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি খাত:
১. বিদ্যুৎ উৎপাদন: তেল ও গ্যাস সংকটে কেন্দ্রগুলো সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিটসহ বেশ কিছু কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং ১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
২. পরিবহন: বাস, ট্রাক, লঞ্চ ও বিমানে জ্বালানি সংকটে ভাড়া বেড়েছে। পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
৩. শিল্প: পোশাক, সিমেন্ট ও স্টিল কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন কমছে। এতে রপ্তানি আয় ও শ্রমিকের বেতন-ভাতা ঝুঁকিতে পড়ছে।
৪. কৃষি: সেচ পাম্প ও ট্রাক্টর চালানোর ডিজেল না পাওয়ায় ফসলি জমি চৌচির হয়ে যাচ্ছে। কৃষকের নাভিশ্বাস উঠছে সারের দাম ও সরবরাহ নিয়ে।
৫. বাণিজ্য: বন্দর ও জাহাজ পরিচালনা ব্যাহত হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ধীর হয়ে পড়েছে।
৬. গৃহস্থালি: গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
৭. সেবা: হাসপাতাল, ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটর নির্ভর হয়ে পড়লেও তেলের অভাবে সেগুলো চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
৮. নির্মাণ: রড-সিমেন্ট উৎপাদন ও নির্মাণ যন্ত্রপাতি পরিচালনায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
৯. পর্যটন ও বিনোদন: হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বিনোদন পার্কগুলোতে দর্শক ও গ্রাহক সমাগম কমেছে।
১০. টেলিযোগাযোগ: বিদ্যুৎ বিভ্রাটে মোবাইল টাওয়ার ও ডাটা সেন্টারগুলোর সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে।
সরকারের ৪টি জরুরি পদক্ষেপ: সংকট মোকাবিলায় সরকার মূলত চাহিদাপক্ষ নিয়ন্ত্রণের (Demand Side Management) ওপর জোর দিচ্ছে:
- বাজার ও বিপণিবিতান খোলা রাখার সময় কমিয়ে আনা।
- পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুতের লোডশেডিং বাড়ানো।
- অফিসের সময়সূচি এগিয়ে আনা।
- সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি ব্যবহারে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই দুর্বল ছিল, ১১৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা ও সুদ পরিশোধের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কেবল চাহিদা কমিয়ে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়; সরকারকে দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি নিশ্চিত করার পথ খুঁজতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও ক্ষুদ্র শিল্প (SME) পুরোপুরি ধসে পড়তে পারে।
















