বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০০ মিলিয়ন চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতায় নতুন এক যুগের সূচনা হয়েছে। এখন ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর এই চ্যাটবট তাদের দৈনন্দিন জীবনের তথ্য ব্যবহার করে অনলাইন কেনাকাটার প্রস্তাব দিচ্ছে, এমনকি কেনাকাটাও সম্পন্ন করছে।
ধরা যাক, সকাল ছয়টায় আপনার ফোনে বার্তা আসে: “আপনি এই সপ্তাহে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন দেখেছি। আপনার পছন্দ অনুযায়ী হোটেলের কাছে তিনটি রেস্টুরেন্ট পেয়েছি। রিজার্ভেশন করে দেব?” আপনি কিছু বলেননি, তবুও এআই আপনার ক্যালেন্ডার ও ইমেল দেখে আগেভাগে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
এরপর আপনি চ্যাটে লেখেন, “স্ত্রীর জন্মদিনে ফুল চাই।” কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফুলের নানান আয়োজন স্ক্রিনে দেখা যায়, আপনি একটি বেছে “Buy now” চাপেন, এবং অর্ডার সম্পন্ন হয়ে যায়।
এটি কল্পকাহিনি নয়। ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ওপেনএআই এবং পেমেন্ট প্রসেসর স্ট্রাইপ একসঙ্গে চালু করেছে “Agentic Commerce Protocol” নামের প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে চ্যাটজিপিটি কথোপকথনের মধ্যেই ইটসি ও ভবিষ্যতে এক মিলিয়নেরও বেশি শপিফাই বিক্রেতার পণ্য কেনা সম্ভব হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি অনলাইন কেনাকাটার ধরন পাল্টে দেওয়ার সবচেয়ে বড় ধাপ—স্মার্টফোন আসার পর প্রথমবার এমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এখনো বিষয়টি টেরই পাচ্ছে না।
গত তিন দশক ধরে ইন্টারনেটে কেনাকাটার নিয়ম ছিল সহজ—চাহিদা খুঁজে গুগলে সার্চ, তুলনা, সিদ্ধান্ত, তারপর ক্রয়। কিন্তু সেই যুগ শেষের পথে।
এআই কেনাকাটার সহকারী তিনটি ধাপে বিবর্তিত হচ্ছে। প্রথম ধাপে “অন-ডিমান্ড এআই”—আপনি প্রশ্ন করলে সে উত্তর দেয়। দ্বিতীয় ধাপে এসেছে “অ্যাম্বিয়েন্ট এআই”—যেখানে এআই নিজে থেকেই প্রস্তাব দেয়, আপনার ইমেল ও ক্যালেন্ডার বিশ্লেষণ করে। পরবর্তী ধাপ “অটোপাইলট এআই”, যেখানে আপনি শুধু বলবেন “আগামী সপ্তাহে ফুল অর্ডার করো”—চ্যাটজিপিটি সব নিজে করবে, পেমেন্টসহ।
প্রতিটি ধাপে সুবিধা বাড়ছে, কিন্তু ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ কমছে।
গবেষকরা সতর্ক করছেন “পরামর্শ বিভ্রম” (advice illusion) নামের এক নতুন সমস্যার বিষয়ে। চ্যাটজিপিটি যখন তিনটি হোটেল সাজেস্ট করে, তখন সেগুলোকে বিজ্ঞাপন নয়, বরং বন্ধুসুলভ পরামর্শ বলে মনে হয়। অথচ ব্যবহারকারী জানেন না, ওই হোটেলগুলো কি অর্থ দিয়ে স্থান পেয়েছে, না অন্য ভালো বিকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে।
গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও মেটাও একই ধরনের প্রযুক্তি তৈরি করছে। যে প্রতিষ্ঠান এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবে, তারা বৈশ্বিক অনলাইন বাণিজ্যের বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
তবে এই সুবিধার বিনিময়ে ব্যবহারকারীরা হারাতে পারেন গোপনীয়তা ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। এআইকে প্রস্তাব দিতে হলে তাকে পড়তে হয় ক্যালেন্ডার, ইমেল ও কেনাকাটার ইতিহাস। ফলে সম্পূর্ণ নজরদারির বিনিময়ে মিলছে সুবিধা।
এছাড়া, ব্যবহারকারীরা এখন যেভাবে সার্চ করে বহু বিকল্প দেখেন, এআই-চালিত কেনাকাটায় তারা হয়তো শুধুমাত্র তিনটি অপশনই দেখবেন—যেগুলো চ্যাটজিপিটি বেছে দেবে। ফলে ছোট ব্যবসাগুলো সহজেই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চ্যাটজিপিটির সাপ্তাহিক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮০০ মিলিয়নে পৌঁছায়—যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুলনায় চার গুণ দ্রুত বৃদ্ধি। প্রযুক্তিটি চালুর কয়েক দিনের মধ্যেই বড় খুচরা বিক্রেতারা এ প্রোটোকল ব্যবহার শুরু করেছে।
ইতিহাস বলছে, মানুষ সবসময় সুবিধার প্রতি দ্রুত অভ্যস্ত হয়। যেভাবে উবার একসময় অবিশ্বাস্য মনে হলেও এখন ১৫০ মিলিয়ন ব্যবহারকারী পেয়েছে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—মানুষ ভবিষ্যতে নিজের কেনাকাটার সিদ্ধান্তে কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “ওপেন ইন্টারনেট” যুগ মানুষকে দিয়েছিল অসীম বিকল্প, কিন্তু এখন এআই যুগ সেই স্বাধীনতাকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিচ্ছে—অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করে কেনাকাটা এত সহজ হয়ে যাচ্ছে যে মানুষ বুঝতেই পারছে না কবে নিজের পছন্দের স্বাধীনতা হারিয়েছে।
একটি কোম্পানি যদি এভাবে সব ডিজিটাল কেনাকাটার দরজা নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে অ্যামাজনের আধিপত্যকেও ছাড়িয়ে যাবে। তাই এখনই দরকার জনসচেতনতা ও খোলামেলা আলোচনার—মানুষ আসলে এমন ভবিষ্যত চায় কি না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, চ্যাটজিপিটির প্রস্তাব দেখলে আগে ভেবে নিন, “যদি আমাকে পাঁচটি ওয়েবসাইট ঘুরে দেখতে হতো, আমি কি এই জিনিসটাই কিনতাম?” নিজের গোপনীয়তা সেটিংস ভালোভাবে পর্যালোচনা করুন এবং পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে এই পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করুন।
কারণ প্রতিবার আপনি “Buy now” চাপলে, আপনি শুধু কিছু কিনছেন না—আপনার অভ্যাস, দুর্বলতা ও সময়ের প্যাটার্ন এআই-কে শেখাচ্ছেন। প্রতিটি সুবিধারই একটা মূল্য আছে, আর প্রতিটি ক্লিকই নতুন ডেটা।
















