বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর নির্ভরশীল: পেট্রোলিয়াম বা জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি সহ) এবং কয়লা। বর্তমানে জ্বালানি আমদানিতে বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং ডলার সংকটের কারণে সরকার অভ্যন্তরীণ মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে।
১. জ্বালানি তেল (Petroleum) মজুত সক্ষমতা
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দেশের জ্বালানি তেল আমদানির প্রধান সংস্থা।
- বর্তমান মজুত ক্ষমতা: বর্তমানে দেশে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল (ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, জেট ফুয়েল ইত্যাদি) মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। এটি দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় দেশের ৩০ থেকে ৩৫ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
- সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (SPM) প্রকল্প: ২০২৪-২৫ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাস করা যাচ্ছে। এটি খালাসের সময় ১১ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় নামিয়ে এনেছে, যা পরোক্ষভাবে মজুত ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
- ২০২৬-এর আমদানি লক্ষ্যমাত্রা: ২০২৬ সালের জন্য বিপিসি প্রায় ১.৩৮ মিলিয়ন টন পরিশোধিত তেল আমদানির পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ডিজেলই প্রধান (প্রায় ৮.৯ লাখ টন)।
২. প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি (LNG) পরিস্থিতি
দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৪৪% আসে গ্যাস থেকে, যার বড় অংশই এখন আমদানিকৃত এলএনজি।
- গ্যাস মজুত (Internal Reserve): ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাস মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। নতুন বড় কোনো ক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে বর্তমান মজুত ২০৩০-২০৩৫ সালের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
- এলএনজি টার্মিনাল ক্ষমতা: বর্তমানে দেশে দুটি সচল ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) রয়েছে (মহেশখালীতে), যাদের সম্মিলিত সক্ষমতা দৈনিক ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট (mmcfd)।
- ২০২৬-এর এলএনজি পরিকল্পনা: ২০২৬ সালে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি প্রায় ৫৪% বৃদ্ধি পাওয়ার কথা রয়েছে। কাতার, ওমান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির সাথে নতুন চুক্তিগুলো ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হতে শুরু করবে।
৩. কয়লা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
কয়লা এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদন উৎস।
- মজুত সক্ষমতা: পায়রা, রামপাল ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিজস্ব কোল ইয়ার্ডে সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫ দিনের কয়লা মজুত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
- উৎপাদন সক্ষমতা: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ইনস্টলড ক্যাপাসিটি প্রায় ৭১৭৯ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৫.৩%।
৪. এলপিজি (LPG) মজুত ও সংকট
বর্তমানে দেশের রান্নার গ্যাসের প্রায় পুরোটাই বেসরকারি আমদানিনির্ভর।
- সরকারি উদ্যোগ: এলপিজি বাজার স্থিতিশীল করতে ২০২৬ সালে বিপিসি নিজেই বাল্ক পরিমাণে এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা করছে। বেসরকারি অপারেটরদের বর্তমানে নিজস্ব টার্মিনাল ও মজুত ব্যবস্থা থাকলেও সরকারি মজুত ক্ষমতা এখনো অনেক কম (মাত্র ১.৩৩%)।
৫. ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও উন্নয়ন প্রকল্প
- ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২: এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের ক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।
- পাইপলাইন সংযোগ: ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১.৮ লাখ টন ডিজেল সরাসরি আসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের জ্বালানি মজুতকে সুরক্ষিত করছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি মজুত বর্তমানে প্রায় ১ মাসের চাহিদার সমান। তবে এলএনজি আমদানিতে কাতার ও ওমানের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এবং হরমুজ প্রণালির মতো ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
















