আমি নিজেকে দূষিত মনে করছিলাম।
একটি গবেষণাগারে দাঁড়িয়ে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে নিজের রক্তের দিকে তাকিয়ে সেই অনুভূতিটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। লাল রক্তকণিকাগুলোর মধ্যে কিছু কণিকায় স্পষ্ট কালো দাগ—যেন কয়লার ক্ষুদ্র টুকরো লেগে আছে। গবেষকদের ভাষায়, এটি বায়ুদূষণের কণা। আমি তখন বিশ্বের প্রথম দিকের মানুষদের একজন, যিনি নিজের শরীরের ভেতরে বায়ুদূষণের উপস্থিতি সরাসরি দেখছেন।
এর ঠিক এক ঘণ্টারও কম আগে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম লন্ডনের ব্যস্ত এক সড়কের পাশে। চার লেনের সেই রাস্তায় গাড়ির সারি থামছিল না। বাতাসে এমন এক ধরনের ঝাঁঝালো ভাব ছিল, যা মুখে লেগে থাকছিল, গলায় খসখসে অনুভূতি তৈরি করছিল। গবেষণার অংশ হিসেবে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে ১০ মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে শ্বাস নিয়েছিলাম।
যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য বায়ুদূষণকে দায়ী করা হয়। এটি গর্ভের শিশুর ক্ষতি করে, হাঁপানি থেকে শুরু করে ডিমেনশিয়ার মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অথচ আমরা বেশির ভাগ সময়ই ভাবি, নাক-মুখ বা ফুসফুসই হয়তো এই দূষণকে আটকে দেয়।
কিন্তু গবেষকরা বলছেন, বাস্তবতা ভিন্ন। গাড়ির ধোঁয়া থেকে নির্গত অতি সূক্ষ্ম কণা—যেগুলোকে পিএম ২.৫ বলা হয়—শুধু ফুসফুসেই আটকে থাকে না। এগুলো রক্তে ঢুকে সারা শরীরে ঘুরে বেড়াতে পারে।
সড়কের ধোঁয়া নেওয়ার পর আমাকে গবেষণাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। আঙুলে সামান্য সুচ ফোটানো হয়, নেওয়া হয় রক্তের নমুনা। অণুবীক্ষণে দেখা যায়, লাল রক্তকণিকাগুলোর গায়ে ছোট ছোট কালো বিন্দু আটকে আছে। এগুলো মূলত জ্বালানি সম্পূর্ণ না পুড়লে তৈরি হওয়া কার্বনের কণা।
গবেষক নরিস লিউ জানিয়েছেন, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের রক্তে গড়ে প্রতি দুই থেকে তিন হাজার রক্তকণিকার মধ্যে একটি দূষণ কণা পাওয়া গেছে। শুনতে সংখ্যাটা ছোট মনে হলেও, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে প্রায় পাঁচ লিটার রক্তের হিসাবে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় আট কোটি রক্তকণিকা, যেগুলো দূষণ বহন করতে পারে।
মাত্র ১০ মিনিট সড়কের পাশে দাঁড়ানোতেই এমন ফলাফল। গবেষকরা বলছেন, দুই ঘণ্টা পরিষ্কার বাতাসে থাকলে রক্তে এই কণার মাত্রা কমে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সময়ের মধ্যে কণাগুলো শরীরের কোথায় যায়?
সব কণা যে নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে যায়, তা নয়। কিছু কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবে বের হতে পারে। তবে গবেষকদের আশঙ্কা, অনেক কণাই রক্তনালির দেয়াল ভেদ করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে জমা হয়—মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, এমনকি গর্ভের শিশুর শরীরেও।
আগেও মানুষের প্লাসেন্টায় বায়ুদূষণের কালো কার্বন কণার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। অর্থাৎ দূষণ জন্মের আগেই শরীরে ঢুকে পড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, পৃথিবীর ৯৯ শতাংশ মানুষই দূষিত বাতাসে শ্বাস নেয়। এর ফলে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশনের মাধ্যমে। এই প্রদাহ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়, ফুসফুসে সুপ্ত ক্যানসার কোষকে সক্রিয় করে তুলতে পারে। যুক্তরাজ্যে প্রতি ১০টি ফুসফুস ক্যানসারের একটি বায়ুদূষণের সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হয়।
গর্ভাবস্থায় বায়ুদূষণ শিশুর ফুসফুস, হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এটি ডিমেনশিয়ার মতো রোগের অগ্রগতিও ত্বরান্বিত করতে পারে।
তাহলে সাধারণ মানুষের করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্ভব হলে ব্যস্ত সড়কের বদলে শান্ত রাস্তা ব্যবহার করা, রাস্তার একেবারে ধারে না হাঁটা, শিশুদের ঠেলাগাড়ি নিয়ে গাড়ির ধোঁয়ার উচ্চতায় না থাকা—এগুলো কিছুটা ঝুঁকি কমাতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, আঁটসাঁট মাস্ক ব্যবহার করলে রক্তে দূষণের পরিমাণ কম হতে পারে, যদিও সবার জন্য মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক সমাধান নয়।
শেষ পর্যন্ত সমাধান ব্যক্তি নয়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়েই। যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার এবং শহরের বায়ুগুণ উন্নত করাই দীর্ঘমেয়াদে একমাত্র পথ। গবেষকদের মতে, যত বেশি আমরা বুঝতে পারব বায়ুদূষণ শরীরের ভেতরে কীভাবে ক্ষতি করছে, তত বেশি চাপ তৈরি হবে দূষণ কমানোর কার্যকর নীতি গ্রহণের জন্য।
















