প্রযুক্তিনির্ভর অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে যখন নতুন ধরনের মেরুকরণ ও বিভাজন তৈরি হচ্ছে, ঠিক সেই সময় সাংবাদিকতার গুরুত্ব নতুনভাবে বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের মহাপরিচালক শেখ নাসের বিন ফয়সাল আল থানি।
মঙ্গলবার দোহায় ওয়েব সামিট কাতার ২০২৬–এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, অ্যালগরিদম, মনোযোগভিত্তিক অর্থনৈতিক মডেল এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি সংলাপের বদলে বিভাজন বাড়াচ্ছে। এতে এমন প্রতিধ্বনি-কক্ষ তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ ভিন্ন বয়ান ও বাস্তবতার জটিলতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
শেখ নাসের বলেন, বিশ্বজুড়ে রাজনীতি, অর্থনীতি ও গণমাধ্যমকে প্রযুক্তি যেভাবে নতুনভাবে গড়ে তুলছে, তাতে সাংবাদিকতা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাংবাদিকতা প্রযুক্তির বিকল্প বা তার বিপরীত নয়; বরং এটি ঘটনাকে প্রেক্ষাপট দেয়, বিভিন্ন কণ্ঠকে যুক্ত করে এবং সংবাদের পেছনের মানবিক গল্পগুলো তুলে ধরে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতার বিকাশকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে জনপরিসরে যে গভীর পরিবর্তন ঘটছে, তা থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, শুধু চমক ও উত্তেজনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া অ্যালগরিদমিক নকশা মানুষের পারস্পরিক বোঝাপড়া নষ্ট করছে।
শেখ নাসেরের মতে, আজকের যুগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তথ্যের অভাব নয়, বরং তথ্যের অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে অর্থ খুঁজে পাওয়া। তিনি বলেন, প্রযুক্তি গল্প বলার সুযোগ গণতান্ত্রিক করলেও এর ফলে এমন বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ অসংখ্য কনটেন্টে ঘেরা থাকলেও আরও একা ও বিচ্ছিন্ন বোধ করছে।
তিনি বলেন, বর্তমান ডিজিটাল ব্যবস্থা জটিল সত্যকে কঠোর দ্বৈত বিভাজনে নামিয়ে আনে, যার ফলে এমন খণ্ডিত বাস্তবতা তৈরি হয়, যেখানে মতভেদ কখনো মুখোমুখি হয় না।
কোর প্রজেক্টের ঘোষণা
দ্রুতগতির প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আল জাজিরা নিজেদের ভূমিকা, দায়িত্ব ও উদ্দেশ্য নতুন করে পর্যালোচনা করতে কোর প্রজেক্ট নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেছে বলে জানান শেখ নাসের।
তিনি বলেন, এটি কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং সাংবাদিকতার মৌলিক ধারণাগুলোর পুনর্মূল্যায়ন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিকে নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করা।
তার ভাষায়, প্রযুক্তির সহায়তায় সাংবাদিকদের এমন সক্ষমতা দেওয়া হবে, যাতে তারা প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে পারেন, ব্রেকিং নিউজে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে পারেন, তথ্য ও পক্ষপাত আলাদা করতে পারেন এবং বিশ্লেষণের শক্তি বাড়াতে পারেন।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে একঘেয়ে ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় করা হবে, যাতে সাংবাদিকরা উচ্চমানের বিশ্লেষণে সময় দিতে পারেন। এর ভিত্তি তিনটি নীতিতে—বর্তমান মুহূর্ত, অর্থ বা প্রেক্ষাপট এবং মানুষ।
তিনি বলেন, শুধু দ্রুততা বা ‘এখন’-এর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দ্রুততা ও নির্ভুলতা জরুরি হলেও সাংবাদিকতার কাজ হলো ঘটনার মূল কারণের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে অর্থ তুলে ধরা।
একই সঙ্গে তিনি দর্শককে কেবল তথ্যভোক্তা বা ডেটা পয়েন্ট হিসেবে না দেখে সচেতন অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
শেখ নাসের বলেন, দ্রুত কিন্তু গভীর, আধুনিক কিন্তু মূল্যবোধে অটল সাংবাদিকতাই সংবাদের প্রেক্ষাপট ফিরিয়ে আনতে পারে, বিতর্কের জায়গা তৈরি করতে পারে এবং মতভেদের মধ্যেও মানবিক দিক তুলে ধরতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাংবাদিকতা ও প্রযুক্তি একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বরং নৈতিক প্রযুক্তির সঙ্গে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশীদারিত্বই বর্তমান সময়ের প্রয়োজন।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি দোহায় উপস্থিত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজকের চ্যালেঞ্জ সাংবাদিকতা ও প্রযুক্তির লড়াই নয়; বরং যৌথ দায়িত্বের মাধ্যমে দুটিকে একসঙ্গে কাজ করানোর সুযোগ। এর মধ্য দিয়েই বিভাজন কমিয়ে সংলাপমুখী একটি বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।
















