বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্যের হঠাৎ বড় পতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সোনা, রুপা, তেল ও শিল্পধাতুর দামে তীব্র দরপতনের ফলে সোমবার বৈশ্বিক বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন প্রধান হিসেবে কেভিন ওয়ার্শকে মনোনীত করার খবরে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত সরে যেতে শুরু করেন। এর প্রভাব পড়ে মূল্যবান ধাতু ও অন্যান্য পণ্যে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বড় ধরনের বিক্রির চাপের মুখে পড়ে সোনা ও রুপা।
সোমবার সোনার দাম প্রায় ৯ শতাংশ কমে গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। রুপার দর কমে যায় ১৩ শতাংশের বেশি। গত সপ্তাহেই এই দুই ধাতু রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। একই সময়ে তেলের দাম প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ কমে কয়েক মাসের উচ্চতা থেকে নেমে আসে। লন্ডনের ধাতুবাজারে তামার দামও প্রায় ৫ শতাংশ হ্রাস পায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারের এই আচরণে স্পষ্ট হচ্ছে যে বিনিয়োগকারীরা নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানকে কঠোর মুদ্রানীতির পক্ষপাতী হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে শক্তিশালী ডলারের প্রভাবও সোনা, রুপা, তেল ও অন্যান্য ধাতুর দামের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, মে মাসে বর্তমান প্রধানের মেয়াদ শেষ হলে কেভিন ওয়ার্শ দায়িত্ব নেবেন। এই ঘোষণার পর থেকেই শেয়ারবাজার ও পণ্যবাজারে বিক্রির চাপ বাড়ে এবং ডলারের মান শক্তিশালী হয়।
এশিয়ার শেয়ারবাজারও এই নেতিবাচক প্রবণতার প্রভাব এড়াতে পারেনি। মূল্যবান ধাতুর বাজারে অস্বাভাবিক দরপতনের কারণে বিনিয়োগকারীরা নতুন সপ্তাহের শুরুতেই সতর্ক অবস্থান নেয়। সামনে করপোরেট আয় প্রতিবেদন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠক ও অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
মূল্যবান ধাতুর বাজারে বিক্রি আরও ত্বরান্বিত হয় যখন শিকাগোভিত্তিক পণ্যবাজার কর্তৃপক্ষ ধাতব ফিউচার চুক্তিতে মার্জিনের হার বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। মার্জিন বাড়লে বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত মূলধন জমা দিতে হয়, ফলে জল্পনামূলক লেনদেন কমে যায় এবং অনেকেই অবস্থান গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন।
শুক্রবারই সোনার বাজারে এক দিনে সবচেয়ে বড় পতন দেখা যায়, যা প্রায় চার দশকের মধ্যে নজিরবিহীন। একই দিনে রুপার দাম ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একদিনের দরপতনের মুখে পড়ে।
জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত পাওয়ায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্যে ইরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতির কথা উঠে আসায় সংঘাতের আশঙ্কা কমেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নৌবাহিনীর সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা না থাকার খবরে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমে।
শিল্পধাতুর বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চীনে উচ্চ মজুত ও দুর্বল চাহিদার আশঙ্কায় তামা ও লৌহ আকরের বাজারে চাপ বেড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধাতু ক্রেতা চীনে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শুরু হতে যাওয়া বসন্ত উৎসবের আগে শিল্পখাতে চূড়ান্ত চাহিদা ও লেনদেন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যান্য পণ্যের মধ্যে টোকিওর রাবারের দাম প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। শিকাগোর গম ও সয়াবিনের দরও প্রায় ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশ্ন হচ্ছে এই পতন কি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত মন্দার সূচনা, নাকি স্বল্পমেয়াদি সংশোধন। তাদের ধারণা, এটি মূলত একটি সংশোধন এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে, মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়।
















