পাকিস্তানের আয়তনে সবচেয়ে বড় হলেও জনসংখ্যায় সবচেয়ে কম বেলুচিস্তান প্রদেশে আবারও ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। সুলায়মান ও কির্থার পর্বতমালার দুর্গম এলাকায় টানা প্রায় ৪০ ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে গভীরভাবে। সাম্প্রতিক এই দফার সহিংসতায় অন্তত ২০০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ১৭ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। বাকি নিহতরা বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধা বলে দাবি করেছে সেনাবাহিনী।
নিষিদ্ধ সংগঠন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি একযোগে এক ডজনের বেশি স্থানে হামলার দায় স্বীকার করেছে। সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় ও দুঃসাহসিক আক্রমণ। যদিও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর বহু সদস্য নিহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করেছে।
কুয়েটায় সরকারি বক্তব্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি ও বেসামরিক প্রাণহানি এই সংঘাতের ভয়াবহতা স্পষ্ট করেছে। উভয় পক্ষই শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করলেও মাটির বাস্তবতায় সেই দাবির সঙ্গে ফারাক রয়ে যাচ্ছে।
বিদেশি ষড়যন্ত্রের বয়ান
ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া বরাবরের মতোই বিদেশি মদদের অভিযোগে কেন্দ্রীভূত। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কার্যক্রমকে ভারতের উসকানি হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে, যদিও দিল্লির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব আসেনি। এই বয়ানে স্থানীয় ও দীর্ঘদিনের বেলুচ ক্ষোভকে আড়াল করে সবকিছু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর চাপানো হচ্ছে।
এই বক্তব্যে নিরাপত্তা বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ সংকটের অংশ নয়, বরং রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। অতীতে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার এক ভারতীয় নাগরিকের ঘটনাও এই যুক্তির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মাটির বাস্তবতা ভিন্ন
তবে বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষের কথাবার্তায় উঠে আসে ভিন্ন এক ছবি। চায়ের দোকান কিংবা স্থানীয় আড্ডায় আলোচনায় বারবার ফিরে আসে রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক অবহেলা আর বৈষম্যের প্রসঙ্গ। বিপুল খনিজ সম্পদের পরও দারিদ্র্য কেন কমছে না, সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খায় সর্বত্র।
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পকে কেন্দ্র করে যে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা অনেক স্থানীয় বাসিন্দার কাছে এখনো অধরা। তাদের ধারণা, এই প্রকল্পের সুফল মূলত কেন্দ্রীয় সরকার ও বিদেশি অংশীদারদের কাছেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন, পরিস্থিতি এতটাই অনিরাপদ যে অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ। খনি এলাকায় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা না থাকায় শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়ই খনি ও কাজের স্থানে হামলা চালায়, অন্য প্রদেশ থেকে আসা শ্রমিকদের হত্যা করে। ফলে প্রদেশটির বহু এলাকা কার্যত আইনশৃঙ্খলাহীন অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
ক্ষোভই আন্দোলনের শক্তি
এই দীর্ঘদিনের অসন্তোষই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। এক নিরাপত্তা সূত্রের ভাষায়, অস্ত্রধারীকে দমন করা যায়, কিন্তু ক্ষোভকে নয়। রাষ্ট্র যাদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখে, অনেক স্থানীয় মানুষ তাদের নিজেদের সন্তান বা ভাই হিসেবে দেখেন, যারা অস্ত্র হাতে নিয়েছে অবিচারের প্রতিবাদে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষে বেসামরিক মৃত্যুর ঘটনাগুলো এই বাস্তবতাকে আরও নির্মমভাবে সামনে এনেছে। যে জনগণের পক্ষে লড়াইয়ের দাবি, সেই জনগণই বারবার এর বলি হচ্ছে।
মানবিক মূল্য ও দীর্ঘ সংকট
বেলুচিস্তান একদিকে সমুদ্রবন্দর ও কৌশলগত প্রকল্পের কেন্দ্র, অন্যদিকে দুর্গম এলাকা যেখানে সংঘর্ষ শুরু হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত বিদ্রোহীদের চলাচলে সুবিধা দেয়, যা কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ।
অতীতের হামলার স্মৃতি আজও মানুষের মনে দগদগে। নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও দুর্বল সামাজিক চুক্তির কথা উঠে আসে বারবার। দুর্নীতির অভিযোগও ব্যাপক, যার ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক খাতে পর্যাপ্ত অর্থ পৌঁছায় না। অনেকের কাছে নিরাপত্তা এখন আর বিশ্বাসযোগ্য কোনো ধারণা নয়।
সামরিক অভিযানে রাষ্ট্রের শক্তি বারবার প্রমাণিত হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অধরাই থেকে যাচ্ছে। অস্ত্র সমর্পণের অনুষ্ঠান বা নতুন করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা ঘোষণার পরও সহিংসতা ফিরে আসে। জাতীয়তাবাদী প্রচারণা নতুন করে যোদ্ধা সংগ্রহে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
স্থিতিশীলতার পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেলুচিস্তানে স্থায়ী শান্তি কেবল নিহতের সংখ্যা দিয়ে অর্জন সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, রাজনৈতিক সংলাপ এবং স্থানীয় মানুষের আস্থা ফেরানো। বিচ্ছিন্নতাবাদ যে বাস্তব ক্ষোভ থেকে জন্ম নিয়েছে, তা স্বীকার না করলে সংকটের অবসান হবে না।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিলতায় বেলুচিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রভাব এবং বৈশ্বিক শক্তির কৌশলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ ফাটলগুলো সারানো।
সহিংসতার ধুলো আবার বসবে, যেমনটি আগে বসেছে। কিন্তু সেই ধুলোর নিচে যদি প্রকৃত শান্তির ভিত্তি না গড়ে ওঠে, তবে পরবর্তী ঝড় আসতে সময় লাগবে না। বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও কার্যকর আঞ্চলিক কূটনীতির ওপর।
















