জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তর মেরু অঞ্চলে সমুদ্রের বরফ দ্রুত কমে গেলেও নরওয়ের আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জ স্বালবার্ডে বসবাসকারী মেরু ভালুকের শারীরিক অবস্থা আশ্চর্যজনকভাবে উন্নত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রত্যাশার বিপরীতে এই অঞ্চলের মেরু ভালুক আগের চেয়ে বেশি মোটা ও সুস্থ হয়ে উঠেছে।
মেরু ভালুক সাধারণত সীল শিকারের জন্য সমুদ্রের বরফকে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে। সীলের চর্বিযুক্ত মাংস তাদের প্রধান খাদ্য, যা শক্তি জোগায়, শরীর উষ্ণ রাখে এবং মা ভালুকদের শাবকদের জন্য পুষ্টিকর দুধ উৎপাদনে সহায়তা করে।
স্বালবার্ডে ১৯৯২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ৭৭০টি প্রাপ্তবয়স্ক মেরু ভালুকের ওজন, উচ্চতা ও শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন গবেষকরা। এতে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালুকগুলোর দেহে চর্বির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গবেষকদের ধারণা, সমুদ্রের বরফ কমে যাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে স্বালবার্ডের মেরু ভালুকরা খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনেছে। তারা এখন স্থলভাগের প্রাণী যেমন হরিণ ও ওয়ালরাস বেশি শিকার করছে।
এই ফলাফল কিছুটা বিস্ময়কর, কারণ একই সময়ে এই অঞ্চলে বরফমুক্ত দিনের সংখ্যা বছরে গড়ে প্রায় চার দিন করে বেড়েছে। মোট মিলিয়ে কয়েক দশকে বরফহীন দিন প্রায় একশ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী জানান, একটি ভালুক যত বেশি মোটা হয়, ততই তা তার জন্য ভালো। বরফের এত বড় ক্ষতির কারণে তিনি ভালুকদের শারীরিক অবস্থার অবনতি আশা করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা গেছে।
নরওয়েতে ওয়ালরাসকে ১৯৫০-এর দশক থেকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, কারণ অতিরিক্ত শিকারের কারণে একসময় তারা প্রায় বিলুপ্তির পথে ছিল। এই সুরক্ষার ফলে ওয়ালরাসের সংখ্যা বেড়েছে, যা মেরু ভালুকদের জন্য নতুন চর্বিযুক্ত খাদ্যের উৎস হয়ে উঠেছে।
এছাড়া বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বরফ কমে যাওয়ায় সীলগুলো ছোট ছোট বরফের এলাকায় একত্রিত হচ্ছে। এতে ভালুকদের জন্য একসঙ্গে বেশি সীল শিকার করা সহজ হতে পারে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ইতিবাচক প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। সমুদ্রের বরফ আরও কমলে ভালুকদের শিকারের জায়গায় পৌঁছাতে বেশি দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে, এতে শক্তি বেশি খরচ হবে এবং দেহের চর্বি দ্রুত কমে যেতে পারে।
আরও গবেষণায় দেখা গেছে, স্বালবার্ডে বরফমুক্ত দিনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাবকদের বেঁচে থাকার হার কমছে। বিশেষ করে কম বয়সী ও বয়স্ক মা ভালুকদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক ভালো অবস্থার একটি কারণ হতে পারে অতীতের অতিরিক্ত শিকার বন্ধ হওয়া এবং জনসংখ্যা পুনরুদ্ধার। পাশাপাশি হরিণ ও ওয়ালরাসের সংখ্যা বৃদ্ধিও সাময়িকভাবে ভালুকদের সহায়তা করছে।
তবে আর্কটিকের অন্য অঞ্চলে চিত্র ভিন্ন। মোট বিশটি পরিচিত মেরু ভালুক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক জায়গায় বরফ কমার সঙ্গে সঙ্গে ভালুকের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। কানাডার পশ্চিম হাডসন উপসাগরে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যেই ভালুকের সংখ্যা কমেছে।
গবেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে মেরু ভালুকের ভবিষ্যৎ স্পষ্ট। তাদের টিকে থাকার জন্য সমুদ্রের বরফ অপরিহার্য। বরফ হ্রাস অব্যাহত থাকলে শেষ পর্যন্ত এই প্রাণীগুলো বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়বে, যদিও স্বল্পমেয়াদে কিছু এলাকায় ভিন্ন চিত্র দেখা যেতে পারে।
















