একসময় যাকে অশুভ লক্ষণ হিসেবে দেখা হতো, আজ সেই বিরল হাড়খেকো সারসই ভারতের এক অঞ্চলে হয়ে উঠেছে গর্ব ও সংরক্ষণের প্রতীক। উত্তর–পূর্ব ভারতের আসামে বিপন্ন এই পাখিটিকে রক্ষায় গড়ে উঠেছে হাজার হাজার নারীর এক ব্যতিক্রমী আন্দোলন, যা এখন স্পষ্ট সাফল্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০০৭ সালের জানুয়ারির এক গরম বিকেলে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে আসামের দাদারা গ্রামে ভয়াবহ এক দৃশ্যের মুখোমুখি হন জীববিজ্ঞানী পূর্ণিমা দেবী বর্মণ। গ্রামের মানুষ একটি বিশাল কদম গাছ কেটে ফেলছিলেন। গাছের ভাঙা ডালপালা ও বাসার ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে ছিল বড় আকারের কালো–সাদা পালকের পাখির মৃতদেহ। সেগুলো ছিল বৃহৎ অ্যাডজুট্যান্ট সারস, স্থানীয়ভাবে পরিচিত হারগিলা নামে।
কিছু ছানা তখনও জীবিত ছিল। একটি ছানাকে বুকে জড়িয়ে ধরার সময় তার হৃদস্পন্দন ও যন্ত্রণায় কেঁপে ওঠা শরীর পূর্ণিমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। যমজ সন্তানের মা হিসেবে সেই মুহূর্তটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, শুধু গবেষণা নয়, এই পাখিগুলোর জন্য বাস্তব কিছু করা জরুরি।
হারগিলা নামের অর্থ হাড়খেকো। মৃতদেহ খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে এই সারস জলাভূমির স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একসময় এশিয়ার নানা অঞ্চলে দেখা গেলেও এখন তারা সীমাবদ্ধ আসাম, বিহার ও কম্বোডিয়ার কিছু এলাকায়। বাসস্থান ধ্বংস, শিকার ও মানুষের বিরূপ মনোভাবের কারণে এদের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে যায়। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার হিসাবে পাখিটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আসামের বহু গ্রামে হারগিলাকে অশুভ পাখি মনে করা হতো। তাদের মল, কোলাহল ও বাড়ির আশপাশে বাসা বাঁধা মানুষকে বিরক্ত করত। কোথাও কোথাও লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য পাখিটি শিকারও করা হতো।
এই পরিস্থিতিতে পূর্ণিমা দেবী বর্মণ শুরু করেন এক অভিনব উদ্যোগ। তিনি গ্রামে গ্রামে গিয়ে নারীদের সঙ্গে কথা বলেন। মায়েদের বোঝান, যেমনভাবে তারা নিজেদের সন্তানকে আগলে রাখেন, তেমনি হারগিলার ছানারাও সুরক্ষার দাবি রাখে। এই মানবিক আবেদন অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
এরই ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে নারীদের সংগঠন হারগিলা আর্মি। শুরুতে অল্প কয়েকজন নারী যুক্ত হলেও ধীরে ধীরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আজ ৪৭টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার নারী হারগিলা রক্ষার শপথ নিয়েছেন।
হারগিলার ভাবমূর্তি বদলাতে নারীরা সাংস্কৃতিক পথ বেছে নেন। গর্ভবতী নারীদের আশীর্বাদ অনুষ্ঠানে হারগিলা পাখির প্রতীক ব্যবহার, পাখির পোশাক পরে নাচ, লোকগান—সবকিছুর মধ্য দিয়ে পাখিটিকে আনন্দ ও শুভতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। হাতে বোনা শাড়ি, কাঁথা, কুশন কাভার ও ওড়নায় হারগিলার নকশা তুলে ধরে নারীরা আয় করার পথও তৈরি করেন।
এই উদ্যোগ শুধু পাখি নয়, নারীদের জীবনও বদলে দেয়। অনেক নারী সেলাই ও কারুশিল্পে দক্ষ হয়ে নিজের ছোট ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। এখন ভ্রাম্যমাণ দোকান, স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র ও অনলাইন মাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে, যার পুরো লাভ যাচ্ছে নারীদের হাতে।
এর ফলও মিলছে। আসামে হারগিলার সংখ্যা ২০০৭ সালের প্রায় চারশ পঞ্চাশ থেকে বেড়ে এখন প্রায় এক হাজার আটশতে পৌঁছেছে। পাখিটি এখন আটটি অঞ্চলে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তৃণমূলের নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও জীবিকার সঙ্গে সংরক্ষণকে যুক্ত করার কৌশল। এতে উদ্যোগটি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। উন্নয়ন প্রকল্পে জলাভূমি সংকুচিত হচ্ছে, অবৈধভাবে বড় গাছ কাটা হচ্ছে। হারগিলার প্রিয় বাসস্থান শিমুল ও কদম গাছ কমে যাওয়ায় তাদের বাসা বাঁধা কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক গাছই এখন ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে, যা সংরক্ষণকে আরও জটিল করে তুলছে।
পূর্ণিমা দেবী বর্মণ বলছেন, হারগিলাকে বাঁচাতে হলে তার গাছকেও বাঁচাতে হবে। এজন্য মানুষের সচেতনতা ও নারীদের ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি।
তার ভাষায়, পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো কণ্ঠ তুলতে শেখা। নারীরা যখন একত্র হন, তখন তারা যেকোনো কিছুকেই রক্ষা করতে পারেন।
















