তুষারে ঢাকা পাহাড়ঘেরা এক বিশাল কারখানায় রোবটের সাহায্যে স্টিলের গাড়ির কাঠামো জোড়া লাগানো হচ্ছে। এরপর সেই কাঠামো ধীরে ধীরে অ্যাসেম্বলি লাইনে নেমে আসে, যেখানে মানবশ্রমে তৈরি হয় সম্পূর্ণ গাড়ি। প্রতি মিনিটে একটি করে নতুন গাড়ি লাইন ছাড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটি স্লোভাকিয়ার উত্তরাঞ্চলের জিলিনা শহরের কাছে কোরীয় গাড়ি নির্মাতা কিয়ার ইউরোপীয় কারখানা।
এই কারখানায় প্রায় ৬৯০টি রোবট কাজ করছে এবং বছরে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন লাখ গাড়ি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। কিয়ার দাবি, এই প্রকল্পে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় আড়াই বিলিয়ন ইউরো।
কিয়া একা নয়। স্লোভাকিয়ায় গাড়ি উৎপাদন করে ভক্সওয়াগেন, স্টেলান্টিস এবং জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার। আগামী বছরগুলোতে বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভলভোও। মাত্র ৫৪ লাখ জনসংখ্যার এই দেশ বছরে প্রায় ১০ লাখ গাড়ি তৈরি করে, যা জনসংখ্যার তুলনায় বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি।
কিয়া কারখানায় কর্মরত ৩৭০০ শ্রমিকের একজন মার্সেল পুখন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই গাড়ির প্রতি তার আগ্রহ ছিল। এখন নিজ হাতে গাড়ি তৈরির কাজে যুক্ত থাকতে পারা তার কাছে স্বপ্নের মতো। আরেক তরুণী কর্মী সিমোনা ক্রনোভা জানান, পারিবারিক কারণে তিনি এখানে কাজ শুরু করেছেন। মাসে তার আয় প্রায় ১৩০০ ইউরো, যা দেশটির গড় আয়ের চেয়ে বেশি হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় মজুরির তুলনায় কম।
কিয়া কর্তৃপক্ষ জানায়, কারখানাটির গড় মাসিক বেতন প্রায় ২৪০০ ইউরো। ২০২৩ সালে স্লোভাকিয়ার গড় মাসিক আয় ছিল প্রায় ১৪০০ ইউরো।
স্লোভাকিয়ার গাড়িশিল্পের উত্থানের পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক পরিবর্তন। একসময় চেকোস্লোভাকিয়ার অংশ থাকাকালে এখানকার গাড়ি মান ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে ছিল। ১৯৮৯ সালের ভেলভেট বিপ্লবের পর কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটে। এরপর ১৯৯১ সালে ভক্সওয়াগেন বিনিয়োগ শুরু করে স্কোডা কারখানায়। ২০০০ সালের মধ্যে পুরো প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা নেয় জার্মান কোম্পানিটি।
পরবর্তীতে চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া আলাদা হওয়ার পর ইউরোপ ও এশিয়ার বড় গাড়ি নির্মাতারা এই অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়াতে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সে সময় স্লোভাকিয়ায় শ্রম ব্যয় ছিল জার্মানির মাত্র ২০ শতাংশ। এখনো পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় এখানে মজুরি কম, তবে উৎপাদনশীলতা অনেক বেশি, যা দেশটিকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।
স্লোভাকিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানও একটি বড় সুবিধা। ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে থাকায় প্রধান বাজারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ। জলবিদ্যুৎ ও পারমাণবিক শক্তির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় এখানে উৎপাদিত বৈদ্যুতিক গাড়ি বিভিন্ন দেশে বেশি ভর্তুকি সুবিধা পায়।
এ ছাড়া দেশটিতে গাড়িশিল্পের জন্য শক্তিশালী সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। প্রায় ৩৬০টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি এই খাতে কাজ করছে। সরকারও কর ছাড় ও প্রণোদনার মাধ্যমে শিল্পটিকে উৎসাহ দিচ্ছে।
জিলিনা শহরের মেয়র জানান, কিয়ার কারণে এই অঞ্চলে বেকারত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে। বর্তমানে কিয়া ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে ২০ হাজারের বেশি মানুষের।
কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিল্পখাতের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও একটি বড় ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি কারখানায় কাজের সুযোগ পাচ্ছে, ফলে দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি হচ্ছে।
স্লোভাকিয়ার পাশাপাশি মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশেও গাড়িশিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। চেক প্রজাতন্ত্র, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া ও সার্বিয়ায়ও বড় বড় আন্তর্জাতিক গাড়ি নির্মাতারা কারখানা স্থাপন করেছে। কম মজুরি, শিল্প ঐতিহ্য ও দক্ষ মানবসম্পদই এই অঞ্চলের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।















