২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এক সময় যে দেশ নিরপেক্ষতা ও কৌশলগত ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করত, এখন তা ধীরে ধীরে চীনের ওপর একপাক্ষিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমার এখন একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী রাষ্ট্র থেকে ক্রমেই ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রে রূপ নিচ্ছে, যা বর্তমান রাশিয়া ও বেলারুশ সম্পর্কের সঙ্গে তুলনীয়।
স্বাধীনতার পর ৭৮ বছরের মধ্যে প্রায় ৬৩ বছরই মিয়ানমার ছিল সামরিক শাসন বা সামরিক সমর্থিত সরকারের অধীনে। এই সময় দেশটি বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থাকতে নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিল। ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ওপেন ডোর নীতির মাধ্যমে পশ্চিমা দেশ, আসিয়ান এবং এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে চীনের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু ২০২১ সালের অভ্যুত্থান সেই কাঠামো ভেঙে দেয়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সামরিক সরকার কার্যত একমুখী পররাষ্ট্রনীতিতে বাধ্য হয়। অর্থনৈতিক সংকট ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার চাপে জান্তা সরকার চীনের সমর্থন পেতে আগের অবস্থান থেকে সরে আসে। ফলে আজকের মিয়ানমার স্বেচ্ছা বিচ্ছিন্নতার নয়, বরং বাধ্যতামূলকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মিয়ানমারের বর্তমান অবস্থাকে বেলারুশ ও রাশিয়ার সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করছেন। যেমনভাবে বেলারুশের নেতা আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো ক্ষমতায় টিকে থাকতে মস্কোর ওপর নির্ভরশীল হন, তেমনি মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন জান্তাও টিকে থাকার জন্য জাতীয় স্বার্থের অংশ চীনের হাতে তুলে দিচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার মতো কোনো কৌশলগত চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা মিয়ানমারের নেই, ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক হয়ে উঠেছে একপাক্ষিক ও অধীনতামূলক।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে চীনের মধ্যস্থতার সুযোগ পাওয়া সার্বভৌমত্ব ক্ষয়ের স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উত্তর শান রাজ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় বেইজিংয়ের ভূমিকা প্রমাণ করে দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
চীনের মূল আগ্রহ মিয়ানমারে ভূ অর্থনৈতিক। বেইজিংয়ের বড় উদ্বেগ হলো মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা, যাকে মালাক্কা ডিলেমা বলা হয়। জ্বালানি পরিবহনে ঝুঁকি কমাতে চীন মিয়ানমারকে ভারত মহাসাগরে প্রবেশের দরজা হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এর মধ্যে রয়েছে রাখাইনের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্র বন্দর, চীন মিয়ানমার তেল ও গ্যাস পাইপলাইন এবং চীন মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর প্রকল্প। মিতসোনে বাঁধও চীনের দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহের অংশ।
এই প্রকল্পগুলো চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশটির গৃহযুদ্ধের কারণে জান্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও দেখছে বেইজিং। তাই সীমান্ত অঞ্চলের জাতিগত প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক রাখছে তারা।
অভ্যন্তরীণভাবে সামরিক সরকার ঋণ ও নির্ভরতার চক্রে আটকে পড়েছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তারা স্থানীয় জনগণের বিরোধিতা উপেক্ষা করে চীনা প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে। এতে জাতীয়তাবাদের দাবি দুর্বল হচ্ছে এবং মিয়ানমার কার্যত এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, যার নামে সার্বভৌমত্ব আছে, কিন্তু বাস্তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই।
এই পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্য সরকার এবং প্রতিরোধ শক্তিগুলোর সামনে কঠিন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে বেইজিং জান্তাকে আরও সমর্থন দিতে পারে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা জনমনে ক্ষোভ তৈরি করতে পারে। তাই তারা বাস্তববাদী পথে চীনের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ রেখে ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক মিয়ানমারকে বেশি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তারা চীনের স্বার্থে আঘাত না করার নীতি নিচ্ছে এবং এক চীন নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
তবুও চীন এখনো সামরিক সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানই মিয়ানমারের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা নষ্ট করেছে। সামরিক শাসন চলতে থাকলে দেশটি স্থায়ীভাবে চীনের রাজনৈতিক অধীনতায় চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো চেষ্টা করছে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করতে, তবে এখনো তাতে বড় সাফল্য আসেনি। শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনতে হলে সামরিক শাসনের অবসান এবং একটি স্থিতিশীল ফেডারেল রাষ্ট্র গঠনই একমাত্র পথ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তখনই দেশটি প্রতিবেশী শক্তিসহ সবার সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে।
















