অতিরিক্ত নিয়োগ ফি, কম বেতন ও পারমিট নবায়নের খরচে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন হাজারো বাংলাদেশি শ্রমিক—যারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে রাখছেন প্রাণ।
পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়া পাড়ি দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরিফুল ইসলাম। এক বছর আগে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দুই মাস অপেক্ষার পর তিনি একটি ভারতীয় রেস্টুরেন্টে চাকরি পান। মাসে ওভারটাইমসহ তার আয় প্রায় ৫৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৩৪ হাজার টাকা দেশে পাঠাতে পারেন তিনি। কিন্তু এখনো ঋণ শোধ শুরু করা যায়নি। এরই মধ্যে নতুন দুশ্চিন্তা—প্রায় ৯২ হাজার টাকা লাগবে ওয়ার্ক পারমিট নবায়নে।
“দেশে দালালরা সহজে কাজ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু এখানে এসে দেখা যায় বাস্তবতা ভিন্ন,” বলেন আরিফুল।
তার অভিজ্ঞতা হাজারো বাংলাদেশি শ্রমিকের গল্প—যারা ঋণ নিয়ে স্বপ্ন নিয়ে মালয়েশিয়ায় যান, কিন্তু কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও গাদাগাদি বাসস্থানে দিন কাটান। যদিও কেউ কেউ স্থায়ী চাকরি পেয়ে ভালো আয়ও করেন, কিন্তু অধিকাংশই থেকে যান অনিশ্চয়তার ভেতরে।
বাংলাদেশের নানা গ্রাম থেকে মালয়েশিয়ার কারখানা, নির্মাণ ক্ষেত্র ও হোটেলগুলোতে পাড়ি জমানো প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে মালয়েশিয়া থেকে রেকর্ড ৩.০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা মোট প্রবাসী আয়ের ১১.৮ শতাংশ।
তবে এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে শ্রমিকদের দুর্ভোগ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দালালদের প্রতারণা ও ভিসা জটিলতায় অনেকের খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার বেশি। কুমিল্লার মোহাম্মদ সিয়াম জানালেন, “প্রায় ৬০ শতাংশ শ্রমিক কষ্টে আছে, বিশেষ করে যারা ফ্রি ভিসা বা দালালের ফাঁদে পড়েছে।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয়, কম মজুরি ও পারমিট নবায়নের ব্যয় শ্রমিকদের ঋণের জালে ফেলে দিচ্ছে। অনেকেই অনানুষ্ঠানিক ঋণ নিচ্ছেন, যেখানে মাসিক সুদ ১০ শতাংশ পর্যন্ত।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে নবায়ন খরচ কমানো এবং চাকরির নিশ্চয়তা বাড়াতে হবে। নইলে এই শ্রমিক শোষণ চলতেই থাকবে।”
২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়, অতিরিক্ত ফি, শ্রমিক অতিরিক্ত সরবরাহ ও ১০১ এজেন্সির সিন্ডিকেট নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকের চিঠিতেও বলা হয়, বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছ থেকে ৪,৫০০ থেকে ৬,০০০ ডলার পর্যন্ত ফি নেওয়া হচ্ছে, যা দুই দেশের চুক্তির নির্ধারিত ৭২০ ডলারের চেয়ে বহু গুণ বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রায় ৯৬ শতাংশ বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ ঋণের কারণে শোষণের ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে সব গল্প হতাশার নয়। টাঙ্গাইলের কালিহাতীর এমদাদ আলী সাত বছর আগে ৪.৫ লাখ টাকা খরচে মালয়েশিয়া যান। এখন তার মাসিক আয় ওভারটাইমসহ প্রায় ৮৬ হাজার টাকা। ব্যয় বাদে তিনি দেশে পাঠান প্রায় ৬০ হাজার টাকা। ফরিদপুরের মনিরুল ইসলামও সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ পেয়ে মাসে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। তারা জানান, স্বচ্ছ ও বৈধ পথে গেলে ঝুঁকি অনেক কম।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি ডেপুটি হাইকমিশনার মোছাম্মৎ শাহানারা মোনিকা বলেন, “উচ্চ ব্যয়, প্রতারণা ও শ্রম শোষণ এখনো বড় সমস্যা। আমরা নিরাপদ অভিবাসন প্রচারণা ও কনস্যুলার সহায়তা জোরদার করছি।”
সরকারি হিসাবে প্রায় ৮ লাখ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় বৈধভাবে কর্মরত, তবে বেসরকারি হিসাবে সংখ্যা দেড় মিলিয়নের কাছাকাছি। তাদের বেশিরভাগই নির্মাণ, উৎপাদন ও খাদ্যখাতে কাজ করেন। গড়ে মাসে ৪৩ হাজার থেকে ১ লক্ষ ১৫ হাজার টাকার মধ্যে আয় করলেও অভিবাসনের খরচ ৪.৫ থেকে ৬ লাখ টাকার মধ্যে হওয়ায় অনেকে বছরের পর বছর ঋণে জর্জরিত থাকেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, “সরকারি প্রণোদনা ও মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের কারণে এখন প্রবাসীরা ব্যাংকের মাধ্যমেই টাকা পাঠাচ্ছেন। ব্যাংক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের রেট প্রায় একই হওয়ায় হুন্ডি কমেছে।”
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শাকিরুল ইসলাম বলেন, “প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হলেও তাদের জীবনে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কেউ ভালো আয় করলেও অনেকে ঋণে জর্জরিত ও অমানবিক পরিবেশে কাজ করছে। শুধু রেমিট্যান্স বাড়ানোর চেয়ে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে।”
বাংলাদেশি শ্রমিকরা মালয়েশিয়ার কারখানা থেকে নির্মাণক্ষেত্র পর্যন্ত অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে অবদান রাখছেন। কিন্তু তাদের রেমিট্যান্সের অঙ্ক যত বড়ই হোক না কেন, এর পেছনে লুকিয়ে থাকে ত্যাগ, সংগ্রাম ও অপূর্ণ প্রত্যাশার গল্প।
নীতিনির্ধারকদের সামনে চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট—ন্যায্য নিয়োগ, কনস্যুলার সহায়তা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যেন প্রবাসী শ্রমিকদের স্বপ্ন ঋণের ফাঁদে না পড়ে, বরং তাদের পরিশ্রমই হোক উন্নয়নের প্রকৃত চালিকা শক্তি।

















