৫৪ বছরেও মান উন্নয়ন হয়নি, আন্দোলনের সংস্কৃতিতে অচল শিক্ষা ব্যবস্থা
সড়ক অবরোধ, শিক্ষক নিপীড়ন ও নীতিগত ব্যর্থতায় শিক্ষাব্যবস্থা এখন আইসিইউতে—এর প্রভাব পড়ছে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর।
গত ১৫ জানুয়ারি ছিল সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস। রাজধানীর মানুষ যখন দুই দিনের ছুটির আগে কাজ শেষ করার ব্যস্ততায়, ঠিক তখনই নতুন করে অচল হয়ে পড়ে ঢাকা। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা কলেজ থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের মিছিল সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ করলে মিরপুর সড়কসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে পড়েন কর্মজীবী মানুষ, রোগী ও শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ অধ্যাদেশ জারির দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করেন। বিকেলে অবরোধ প্রত্যাহার করা হলেও আন্দোলনের নেতারা নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেন, যা স্পষ্ট করে দেয়—রাজপথের আন্দোলন আপাতত থামছে না।
রাজধানীতে সড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ের চিত্র এখন আর ব্যতিক্রম নয়। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ঢাকায় এক হাজারের বেশি সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। এর একটি বড় অংশই ছিল শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আন্দোলন। একাধিকবার একই সড়ক দিনের পর দিন অচল থেকেছে সংঘর্ষ ও পাল্টা কর্মসূচির কারণে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন হাসপাতালে যাতায়াতকারী রোগী ও জরুরি সেবাগ্রহীতারা।
এই পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—শিক্ষার্থীরা কেন শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজপথে বেশি সক্রিয়? আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যেকোনো দাবি আদায়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সড়ক অবরোধ। সরকারও অনেক ক্ষেত্রে এই চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে। ফলে আন্দোলনের এই সংস্কৃতি আরও উৎসাহ পাচ্ছে।
শিক্ষাঙ্গনের ভেতরের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা, জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা বাড়ছে। অনেক শিক্ষক নিরাপত্তাহীনতার কারণে ক্লাস নিতে সাহস পাচ্ছেন না। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু শিক্ষকরাও এই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় বছরের মতো সময়মতো পাঠ্যবই সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। জানুয়ারির মাঝামাঝিতেও কোটি কোটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি। রাষ্ট্র সংস্কারের নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্ব ইতিহাস প্রমাণ করে—যে দেশগুলো শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে এগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত কিংবা চীনের উন্নয়নের ভিত্তি ছিল পরিকল্পিত ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা। অথচ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশ এখনো শিক্ষার মান উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
এই শিক্ষাব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর। শিক্ষায় শৃঙ্খলা ও মান নিশ্চিত করতে না পারলে ‘নতুন বাংলাদেশ’ কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সামনে জাতীয় নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার এটাই সময়। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তাদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানো এবং শিক্ষার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি, দলনিরপেক্ষ জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
আজ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত আইসিইউতে। প্রশ্ন একটাই—রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জাতীয় ঐকমত্য দিয়ে কি আমরা শিক্ষাকে বাঁচাতে পারব?
















