১১ জানুয়ারি ২০২৬: প্রায় তিন বছর পর যুদ্ধকালীন রাজধানী পোর্ট সুদান থেকে দেশটির মূল রাজধানী খার্তুমে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সুদানের সরকার। প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিস রোববার খার্তুমে সাংবাদিকদের জানান, সেনাবাহিনী–সমর্থিত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আবার রাজধানী থেকেই কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করবে।
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুদানি সশস্ত্র বাহিনী ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরুর পরপরই খার্তুম দ্রুত আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সে সময় নিরাপত্তার কারণে সরকার রাজধানী ছেড়ে লোহিত সাগর উপকূলীয় শহর পোর্ট সুদানে সরে যায়।
গত বছরের মার্চে সেনাবাহিনী খার্তুম পুনর্দখলের পর থেকেই ধাপে ধাপে রাজধানীতে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইদ্রিস বলেন, আজ আমরা আবার ফিরে এলাম এবং আশার সরকার আবার জাতীয় রাজধানীতে কার্যক্রম শুরু করল। তিনি রাজধানীবাসীকে উন্নত সেবা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার পুনর্গঠন, হাসপাতাল সংস্কার, শিক্ষা খাতের উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রায় দুই বছর ধরে খার্তুম, ওমদুরমান ও খার্তুম নর্থ বা বাহরি নিয়ে গঠিত বৃহত্তর রাজধানী অঞ্চলটি ছিল সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র। বহু এলাকা অবরুদ্ধ ছিল, নীল নদের দুই তীর থেকে পাল্টাপাল্টি গোলাবর্ষণ চলেছে এবং লাখো মানুষ শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে অক্টোবরের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ মানুষ খার্তুমে ফিরে এসেছেন। তবে ফিরে আসা অনেকেই ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি, কার্যত অচল পরিষেবা ব্যবস্থা এবং অস্থায়ী কবরস্থানে ভরা পাড়া-মহল্লার চিত্র দেখেছেন, যেগুলো এখন কর্তৃপক্ষ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের কারণে রাজধানীতেই কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি। বহু পরিবার বাধ্য হয়ে অস্থায়ীভাবে মৃতদের দাফন করায় সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, খার্তুমের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্গঠনে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সরকার খার্তুমে কিছু মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছে এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করেছে। যদিও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত, তবু আরএসএফ মাঝে মাঝে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, বিশেষ করে অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুতে।
অন্যদিকে রাজধানীর বাইরে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। খার্তুমের দক্ষিণে কর্দোফান অঞ্চলে আরএসএফ অগ্রসর হয়েছে। গত বছর দারফুরে সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি দখলের পর এই অঞ্চলেও তীব্র লড়াই চলছে।
সুদানের সেনাবাহিনী শুক্রবার জানিয়েছে, দারফুর ও কর্দোফানে সাম্প্রতিক এক সপ্তাহের আকাশ ও স্থল অভিযানে তারা আরএসএফকে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। সেনাবাহিনীর দাবি, এসব অভিযানে প্রায় ২৪০টি যুদ্ধযান ধ্বংস করা হয়েছে এবং শত শত যোদ্ধা নিহত হয়েছে। তারা আরও জানায়, বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে আরএসএফকে হটানো হয়েছে এবং বাকি সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, আর আরএসএফও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষ দেশের ভেতরে ও বাইরে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্য সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘ উত্তর দারফুরের এল-ফাশের শহরকে কার্যত একটি ‘অপরাধস্থল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখানে আরএসএফ দখলের পর ব্যাপক সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
















