স্টকহোম। ১৯৯৩ সালে বসনিয়া যুদ্ধের সময় একজন শরণার্থী হিসেবে যে সুইডেন আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল, সেই সুইডেন আর আগের মতো নেই। সময়ের সঙ্গে দেশটি যেন তার মানবিকতা ও সহানুভূতির একটি বড় অংশ হারিয়ে ফেলেছে। এই বাস্তবতা আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।
ছুটির মৌসুম শেষে সুইডেনে আনন্দ, বিশ্রাম আর নতুন বছরের আশাবাদ নিয়ে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ২০২৫ সাল শেষ হয়েছে বর্ণবাদ, ইহুদিবিদ্বেষ ও ইসলামবিদ্বেষের উত্থানের মধ্য দিয়ে। ডানপন্থী সুইডেন ডেমোক্র্যাটস দল রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করেছে, পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গকে তার রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে এবং সরকার উন্নয়ন সহায়তা কমিয়েছে প্রায় এক হাজার কোটি ক্রোনা।
ছুটির ঠিক আগে স্টকহোমের কেন্দ্রীয় মসজিদের বেড়ায় গুলির চিহ্নসহ একটি কোরআন ঝুলিয়ে রাখা হয়। একই সময়ে ইরানি এক দম্পতি, যারা দীর্ঘদিন সুইডিশ হাসপাতালে সহকারী নার্স হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের সন্তানসহ তেহরানে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নতুন বছরে সুইডেন একটি নির্বাচনের মুখোমুখি, যেখানে অপরাধী ও যারা সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে না বলে বিবেচিত, তাদের বহিষ্কারের মতো কঠোর বক্তব্য রাজনৈতিক ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।
একজন বসনিয়ান সুইড হিসেবে আমি চাই আমার দুই দেশই আরও ভালো হোক। বসনিয়া যেন জাতীয়তাবাদী বিষ থেকে মুক্ত হয়ে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়, আর সুইডেন যেন সেই সহমর্মিতার চেতনা ফিরে পায়, যে চেতনা একসময় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও হাজার হাজার বসনিয়ান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত সুইডেনের জন্যও সফল হয়েছিল, আর বসনিয়ানরা এখানে সবচেয়ে ভালোভাবে একীভূত সংখ্যালঘুদের একটি হিসেবে পরিচিত।
আজ আর সেই সময় নেই, যখন কোনো সুইডিশ যাজক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবরুদ্ধ সারায়েভোতে ত্রাণ পৌঁছে দিতেন। সহানুভূতির জায়গায় এখন উদাসীনতা গড়ে উঠেছে, আর যারা মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ায়, তারা ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয়।
আমি অন্য এক সুইডেনকে মনে করি। যুদ্ধের শুরুর দিকে বানজা লুকায় এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়েছিল, যার মেয়ে শরণার্থী হয়ে সুইডেনে গিয়েছিল। রেড ক্রসের মাধ্যমে পাঠানো চিঠিতে সে ভ্যারগার্দা নামের এক জায়গার কথা লিখেছিল, যেখানে প্রকৃতি ছিল নিস্পাপ ও শান্ত। কয়েক বছর পর আমিও সেই একই শরণার্থী শিবিরে পৌঁছাই।
শিবিরের জীবন ছিল কঠিন। আমরা সবাই ছিলাম মানসিক আঘাতে ক্ষতবিক্ষত বসনিয়ান, এক দেশ থেকে আসা হলেও একে অপরের কাছে অপরিচিত। সুইডিশ সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সীমিত। তবুও ছোট ছোট মানবিক আচরণ মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।
এক শীতের দিনে ট্রলহাটানে পৌঁছে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে একটি রেকর্ডের দোকানে ঢুকেছিলাম। দোকানের কর্মী আমাকে গরম মশলাদার পানীয় গ্লগ খেতে দেন। সেটাই ছিল আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। ভাষা না জেনেও তিনি আমাকে শরণার্থী শিবিরের পথ দেখিয়ে দেন।
মুলশোতে শরণার্থী শিবিরে আমি স্থানীয় জুডো ক্লাবে অনুশীলন করতাম। কিছু পূর্বধারণা থাকলেও মানুষজন ছিল ভদ্র ও দায়িত্বশীল। আমি সবসময়ই দেখেছি আমাকে দেখভাল করা হচ্ছে।
তখন কিছু মানুষ ছিল যারা অভিবাসীদের নিয়ে নেতিবাচক কথা বলত। কিন্তু তারা ছিল অল্প। এখন সে সংখ্যা অনেক বেড়েছে। চাকরি দিতে অনীহা, সন্দেহ আর দূরত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি।
পরবর্তীতে স্টকহোমে গিয়ে আমি এক বৃদ্ধ সুইডিশ ব্যক্তির সেবায় দীর্ঘ সময় কাজ করি। তার কাছ থেকেই আমি সহমর্মিতা আর মানবিকতার শিক্ষা পেয়েছি। সেখান থেকেই ইকিয়ার সস্তা নাশতার সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সেখানে একসঙ্গে বসে নাশতা করত, যা বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানের প্রতীক ছিল।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই নাশতাও বদলে গেছে। দাম বেড়েছে, আন্তরিকতা কমেছে, আর সেই পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে।
আমি পরিবর্তনকে ভালোবাসি, আবার ভয়ও পাই। সুইডেন এখন সাংস্কৃতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ, কিন্তু একই সঙ্গে অন্যদের প্রতি আরও ঠান্ডা। আমি আজও সেই গ্লগের স্বাদ আর সেই সাহসী হৃদয়ের মানুষদের কথা মনে করি, যারা বিপদের মুখেও মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছিল।
হয়তো একদিন, আমার নাতি নাতনিদের সময়ে, সুইডেন আবার তার হারানো সহমর্মিতা ফিরে পাবে। তখন হয়তো আমরা আবার সেই পুরনো ইকিয়ার নাশতার টেবিলে ফিরে যাব, নতুন হলেও একই রকম মানবিকতায় ভরা।
















